নাম তার সিয়াম, বয়স ১৪। অটোরিকশার লোভে কিশোর সিয়ামকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা—অভিযোগ পরিবার ও এলাকাবাসীর। এই নির্মম ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকায়। সিয়াম ওসমান আলীর একমাত্র ছেলে। তাদের সংসারের একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম ছিল ওই অটোরিকশা। পরিবারের স্বপ্ন আর হাসি-কান্না জড়িয়ে ছিল সেই যানটির সঙ্গে। কিন্তু সেই অটোরিকশাই কেড়ে নিল সিয়ামের প্রাণ।
অটোরিকশায় ওঠা–নামার রহস্য : সিসি ক্যামেরায় নাজমুল-সুমন-রফিক, পরে দেখা যায় ইমরানকে।
ঘটনার সূত্রপাত উত্তর বাড্ডার আব্দুল্লাহবাগ মোড়ে। সেখানকার সিসি ক্যামেরায় দেখা যায়, নাজমুল, সুমন ও রফিক নামে তিনজন যাত্রী বাড্ডা থেকে উঠে এসে একপর্যায়ে সেখানে নেমে যায়। পরবর্তী সিসি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে স্বদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানী টিম দেখতে পায়, আব্দুল্লাহবাগ মোড় থেকে অটোরিকশার ড্রাইভিং সিটে দেখা যায় ইমরান নামে পূর্বপরিচিত এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে। তার পাশেই বসানো হয়েছিল সিয়ামকে। তৃতীয় সিসি ফুটেজে দেখা যায়, সিয়ামকে অটোরিকশায় বসিয়ে আরও দুজনকে ওঠানো হয়।
সিসি ফুটেজ ও সিয়ামের বাবার বর্ণনা অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সিয়ামকে অটোরিকশায় করে নিয়ে যাওয়া হয় জলসিড়ি আবাসন প্রকল্পের ১৫ নম্বর সেক্টরের চায়না রেডিমিক্স কোম্পানির উত্তর পাশের নির্জন রাস্তার দিকে। ঘটনার তথ্য বলছে, সেখানেই হত্যা করা হয় সিয়ামকে। পরে তার অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায় খুনিরা।
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে এক পথচারী লাশটি দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন। রূপগঞ্জ থানা পুলিশ এসে লাশটি উদ্ধার করে। পরিচয় না পাওয়ায় লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লার পাঠানতলী কবরস্থানে আঞ্জুমান মফিদুলের সহায়তায় দাফন করা হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় সিয়ামের পরিহিত পোশাক দেখে নিশ্চিত হয় পরিবার। পরবর্তীতে সিয়ামের পরিবার রূপগঞ্জ থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে। পুলিশ সেদিন দাফনের সময় তোলা ছবি ও পোশাক পরিবারের সামনে উপস্থাপন করলে—উভয় পক্ষ নিশ্চিত হয়, লাশটি সিয়ামের।
নিহত সিয়ামের বাবা ওসমান আলী স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, “আমি তো আমার ছেলেকে আর পাব না, গাড়িও পাব না। আমি আমার সন্তান, গাড়ি—কিছুই চাই না। প্রকৃত হত্যাকারীর বিচার চাই।”
নিহত সিয়ামের মা জুলেখা আক্তার বলেন, “যেদিন আমার ছেলে সিয়ামকে মেরেছে সেদিন ইমরান আমার হাতে ভাত খেয়েছে। আমাদের আরেকটা গাড়ি দিয়ে সিয়ামের বাবার সঙ্গে খোঁজার অভিনয় করেছে। আমি আমার নিষ্পাপ ছেলেটার হত্যাকারীর বিচার চাই প্রশাসনের কাছে।”
সিয়ামের বড় ভাই বলেন, “যে হত্যা করেছে সে আমাদের পূর্বপরিচিত। সে আমার আব্বুর সঙ্গে চলাফেরা করত। আমরা তাকে কাকা বলে সম্বোধন করতাম। এ কাজ কেমন করে করতে পারল সে? আমি আমার ভাইয়ের হত্যাকারীর বিচার চাই।”
মূল সন্দেহভাজন ইমরান—তবু তাকে আটক করেনি পুলিশ!
রূপগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতনামা হত্যা মামলা হওয়ার পর প্রথম সিসি ফুটেজের ভিত্তিতে আটক করা হয় নাজমুল, সুমন ও রফিককে। কিন্তু দ্বিতীয় সিসি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেলেও সন্দেহভাজন ইমরানকে আটক করেনি পুলিশ। আরও বিস্ময়ের বিষয় সিয়াম নিখোঁজ হওয়ার আগে সর্বশেষ যিনি সিয়ামের অটোরিকশায় ছিলেন তিনি ইমরান। ঘটনার পর পূর্বের তিন যাত্রীকে ধরিয়ে দিতে সহযোগিতা করলেও—দ্বিতীয় সিসি ফুটেজ সংগ্রহ শুরুর পর হঠাৎই নিখোঁজ হয়ে যান ইমরান। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে স্থানীয়দের বক্তব্য, “ইমরানই মূল হত্যাকারী হতে পারে”—এই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। ঘটনাস্থল—এক নির্জন জনমানবহীন এলাকা, স্থানীয়দের মতে ‘অপকর্মের উপযোগী স্থান’।
স্থানীয়রা জানান, সাধারণ মানুষ এখানে আসে না। অপরাধীরা এ ধরনের জায়গাই বেছে নেয়। এ ধরনের হত্যা তারাই করতে পারে যারা নিয়মিত মানুষ হত্যা করে। আমরা শুনেছি সিয়ামের নামে এলাকায় আরও একাধিক মামলা রয়েছে। আমরা এই হত্যার বিচার চাই। মূল হত্যাকারী ইমরানের ফাঁসি চাই।
এ বিষয়ে রূপগঞ্জ থানার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহিম স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, “মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্তের কোনো ঘাটতি নেই। এটি অ্যানন মার্ডার, প্রকৃত হত্যাকারীকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। তিন দিন পর লাশ পাওয়া গিয়েছে, কে হত্যা করেছে কেউ দেখেনি। কোনো সিসিটিভি ফুটেজ নেই, ক্লু ধরে এগোচ্ছি। জলসিড়ি ও বাড্ডার দুটি সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। সন্দেহভাজন তিনজনকে আমরা আটক করেছি। এদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কোর্টে হস্তান্তর করেছি। এদের কল রেকর্ড সংগ্রহ করে দ্রুতই প্রকৃত হত্যাকারীকে ধরা হবে। আমরা আরও বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করছি।”
দুই মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তের ধীরগতি দেখে স্বদেশ প্রতিদিন রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, “আমরা আমাদের মতো করে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমরা বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে মূল আসামিকে শনাক্ত করতে পেরেছি। শনাক্ত করাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। মূল হত্যাকারী ইমরান এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তার এনআইডি পাওয়া যায়নি, বরগুনায় বাড়ি হলেও তাদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। আশা করি দ্রুতই তাকে গ্রেফতার করা হবে।”
সিয়ামের পরিবারের আর্তনাদ, “একটি অটোরিকশার চেয়ে কি একটি জীবনের মূল্য কম?” এ প্রশ্নই আজ ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড্ডার গলিতে-গলিতে। সামান্য লোভ, নির্মমতা আর পরিকল্পিত ফাঁদে হারিয়ে গেছে ১৪ বছরের এক কিশোরের জীবন। অপেক্ষা কেবল, সত্যিকারের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার এবং ন্যায়বিচারের।