আগামী এক দশকে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ১৫ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কাজের সুযোগ তৈরির এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তার বদলে দিচ্ছে শ্রমবাজারের চাহিদা ও নিয়োগের ধরন। প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও কিছু পেশায় নিয়োগের চাহিদা কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও তরুণদের কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনে গতকাল সোমবার শ্রমবাজারবিষয়ক এক অধিবেশনে এসব বিষয় উঠে আসে। ‘লেবার মার্কেটস ইন এশিয়া: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ ইন দ্য এজ অব এআই’ শীর্ষক অধিবেশনে আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ দিব্য কীর্তি শ্রমবাজারবিষয়ক গবেষণার তথ্য তুলে ধরেন।
আলোচনায় বলা হয়, আগামী ১০ বছরে এশিয়ার উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা ও কাজের ধরন সমন্বয় করা জরুরি। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে অধিক উৎপাদনশীল শিল্প ও সেবাখাতে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের পাশাপাশি এআইয়ের প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে দেশগুলোকে।
চাকরির বিজ্ঞাপনে এআই-দক্ষতার চাহিদা দ্বিগুণ
আইএমএফের গবেষণায় প্রায় ৭০ কোটি চাকরির বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এআইয়ের প্রভাব বেশি এমন পেশাগুলোতে এআই-সম্পর্কিত দক্ষতার চাহিদা তুলনামূলক কম প্রভাবিত পেশার প্রায় দ্বিগুণ। নিয়োগদাতারা এখন এমন কর্মী খুঁজছেন, যাঁরা এআই ব্যবহার করে কাজের গতি, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবেন।
গবেষণায় এআইয়ের সাধারণ ব্যবহার, বিশেষায়িত নির্দেশনা তৈরির দক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্যভান্ডারের সঙ্গে এআইয়ের কার্যকর সমন্বয়ের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রাথমিক ধারণা থাকলেই হবে না; বাস্তব সমস্যার সমাধান, তথ্য বিশ্লেষণ এবং কাজের মান উন্নয়নেও এর প্রয়োগ জানতে হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় নিয়োগের চাহিদায় পরিবর্তন
আইএমএফের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এআইয়ের প্রভাব বেশি এমন পেশার তুলনায় কম প্রভাবিত পেশাগুলোতে নিয়োগের চাহিদা প্রায় ১০ শতাংশ বেশি ছিল। প্রোগ্রামিংয়ের মতো প্রযুক্তিনির্ভর কাজে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ায় নিয়োগের ধরন পরিবর্তিত হওয়ার বিষয়টি এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে নিয়োগের চাহিদায় এই পার্থক্যের অর্থ এই নয় যে প্রোগ্রামারদের ১০ শতাংশ চাকরি হারিয়েছেন। বরং তথ্যটি বিভিন্ন পেশায় নিয়োগের চাহিদার তুলনামূলক পরিবর্তন নির্দেশ করে।
এআইয়ের মাধ্যমে কোড লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে কিছু কাজে মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমতে পারে। অন্যদিকে এআই পরিচালনা, ফলাফল যাচাই এবং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারেন—এমন কর্মীদের গুরুত্ব বাড়ছে।
এশিয়ার দেশগুলোর চ্যালেঞ্জ ভিন্ন
এশিয়ার সব দেশের শ্রমবাজারের সমস্যা এক নয়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কয়েকটি উন্নত অর্থনীতি বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এসব দেশে এআইয়ের সাহায্যে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো গেলে শ্রমিকসংকটের কিছুটা প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই বড় চ্যালেঞ্জ। এসব দেশে শিল্প ও সেবাখাত সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর্মীদের নতুন প্রযুক্তির উপযোগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এ কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে—একদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অন্যদিকে পরিবর্তিত শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরি।
তরুণদের প্রথম চাকরি নিয়েও উদ্বেগ
এআইয়ের বিস্তারে কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণদের চাকরির সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আগে নতুন স্নাতকেরা যেসব প্রাথমিক কাজের মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতেন, এআই এখন সেসব কাজের কিছু অংশ সম্পন্ন করতে পারছে। ফলে নতুন কর্মীদের জন্য চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ বদলে যেতে পারে।
তবে তরুণ কর্মীরা অভিজ্ঞ কর্মীদের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন—এমন সুস্পষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সমন্বয়, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশি এবং কর্মজীবনজুড়ে নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান নয়, বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মজুরি ও কর্মসংস্থানে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনিশ্চিত
এআইয়ের কারণে মজুরি কমছে বা বাড়ছে—এমন সুস্পষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। আইএমএফের গবেষণায় মূলত নিয়োগের চাহিদা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার পরিবর্তন উঠে এসেছে। দীর্ঘ মেয়াদে মজুরি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এআইয়ের প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তির বিস্তার, বিনিয়োগ এবং শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা
বাংলাদেশের মতো তরুণ জনগোষ্ঠীনির্ভর অর্থনীতির জন্য এশিয়ার শ্রমবাজারের এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি পোশাকশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক সেবা, কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় এআইয়ের ব্যবহার উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে প্রচলিত কাজের কিছু অংশ স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেলে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন এবং বিকল্প কাজের উপযোগী প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হবে।
বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, ব্যবহারিক প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ এবং কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি নতুন শিল্পে বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করতে হবে।
এশিয়ার সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু বিপুলসংখ্যক নতুন চাকরি সৃষ্টি করা নয়; সেই চাকরিগুলোর উপযোগী দক্ষ কর্মী তৈরি করাও। আগামী দশকে কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণে বিনিয়োগ, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার ও দক্ষতা উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়াই হবে দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ