
রাজশাহী-৩ (পবা–মোহনপুর) আসন ঘিরে এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আলোচনা তুঙ্গে। সরকারবিরোধী ভোটব্যাংকের দৃঢ় অবস্থান থাকলেও এবার মূল লড়াই সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–র মধ্যকার দুই শীর্ষ প্রার্থীকে ঘিরে।
এই আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক সহ-সচিব এ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন; অন্যজন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–র কাশিয়াডাঙ্গা থানা শুরা-কর্মপরিষদ সদস্য ও হড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের দীর্ঘ ২৮ বছরের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ। ফলে এ আসনে ভোটের সমীকরণ দাঁড়িয়েছে—জনপ্রিয়তা বনাম তৃণমূল সংগঠন।
পবা–মোহনপুর এলাকা কৃষি-নির্ভর এবং শিক্ষিত জনসংখ্যার অনুপাত তুলনামূলক বেশি। গ্রামাঞ্চলে জামায়াতের তৃণমূল শক্তি এবং শহর–নগরঘেঁষা এলাকায় বিএনপির জনপ্রিয়তা দুইয়ের সমন্বয়ে এই আসনকে বিশ্লেষকেরা বলছেন “হটসিট”।
বিএনপি প্রার্থী এ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন পেশায় আইনজীবী। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, স্থিতিশীল নেতৃত্ব, কেন্দ্রীয় দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং শিক্ষিত–তরুণ ভোটারদের আস্থায় তিনি এ লড়াইয়ে শক্ত অবস্থানে আছেন। নগরঘেঁষা এলাকাগুলো—বিশেষ করে পবা, নওদাপাড়া, নওহাটাসহ বেশ কিছু অঞ্চলে তার ভোট ব্যাংক শক্ত। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সরকারবিরোধী মনোভাব—এসব জাতীয় ইস্যু মিলনের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে হড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইউনিয়ন পরিষদের এই সরাসরি দায়িত্ব তাকে স্থানীয় মানুষের নিকট সহজপ্রাপ্য করে তুলেছে। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান–কেন্দ্রিক জনসংযোগ, মসজিদ–মাদ্রাসাভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং তৃণমূল পর্যায়ের স্থায়ী নেতাকর্মী তার প্রধান শক্তি। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় তিনি অত্যন্ত সংগঠিত ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মোহনপুর ও পবা উপজেলার একাধিক গ্রামাঞ্চলে আজাদকে এগিয়ে রাখছে স্থানীয় মূল্যায়ন।
নগর ও শিক্ষা-নির্ভর ভোটারগোষ্ঠী বিএনপির দিকে ঝুঁকলেও গ্রামের মাদ্রাসা–মসজিদ জামায়াতপন্থী; ফলে লড়াইটি হবে শহর বনাম গ্রামের। তরুণ ভোটারদের মাঝে মিলন বেশি জনপ্রিয় হলেও ধর্মীয় ভোট ব্যাংক আজাদের শক্তি বাড়ায়। মাঠের বাস্তবতা বলছে—এ লড়াই হবে উত্তেজনাপূর্ণ ও কাছাকাছি হার-জিতের। ভোট শতাংশে সামান্য ব্যবধানই নির্ধারণ করে দিতে পারে কে জয়ী হবেন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়হীনতা এবং দ্বিধাবিভক্ত ভোটের সম্ভাবনা ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যদি আঞ্চলিক সমন্বয় সঠিকভাবে হয় এবং বিএনপির কৌশলগ্রহণ জোরদার হয়, তবে মিলন এগিয়ে থাকতে পারেন। বিপরীতে, ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ ও গ্রামভিত্তিক ভোটারের উপস্থিতি বেশি হলে জামায়াতের পক্ষে সমীকরণ বদলে যেতে পারে।
বিশ্লেষণ বলছে— সুষ্ঠু ভোট হলে বিএনপির মিলন সামান্য এগিয়ে আর গ্রামভিত্তিক হলে জামায়াতের আজাদ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী।
তাই সব মিলিয়ে বলা যায়—রাজশাহী-৩ আসনে এবারের নির্বাচন হবে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। জনপ্রিয়তা, সংগঠনশক্তি, সামাজিক যোগসূত্র ও ভোটকেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা সবই এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ হতে পারে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএস