
মেয়েকে ভর্তির কোচিং ক্লাসে ঢুকিয়ে আইন পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ সংবিধান পাঠে মনোযোগ দিলাম। ভালো রেজাল্ট প্রত্যাশি ছাত্রের মতো নিজে নিজেই একটু সাজেশন তৈরী করার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পাশের দুই ভদ্র মহিলার আলাপচারিতায় মনোযোগ চলে গেল।
প্রথম জন দ্বিতীয় জনকে বলছেন, "শাশুড়ি কে কত করে বললাম যে ঐ 'বেডইক্যা' মেয়েটাকে দেবরের জন্য না আনতে।" কিন্তু শাশুড়ি অনড়, কারণ এর আগের কোন বৌ তিনি দেখে আনেন নাই, তাই এবার তার মনের মতো বৌ আনতে চান।
এদিকে আমি খুঁজতে খুঁজতে আইন পরীক্ষার কমন প্রশ্ন পেয়ে গেলাম ' যুদ্ধ ঘোষণা'। ইদানিং আবার লোকজন এমনকি সরকারি কর্মচারীরাও দেখছি 'যুদ্ধ ঘোষণার' ডাক দিচ্ছেন, তাই ভাবলাম এ প্রশ্ন কমন না এসে পরেই না। কিন্তু সংবিধান উল্টাতে গিয়ে আর্টিকেল ৬৩ তে গিয়ে দেখলাম যে সংসদের অনুমোদন নিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতিই কেবল 'যুদ্ধ ঘোষণা' করতে পারেন। ভাবলাম যে এ তথ্যটা না জেনে যদি মিডিয়ার কথায় পরীক্ষার খাতায় লেখে দিতাম তাহলে আইন পরীক্ষার ফলাফলও এবারের উচ্চ মাধ্যমিক এর ফলাফলের মতোই হতো!
এদিকে আবার ঐ প্রথম ভদ্র মহিলার কথায় কানে আসলো। তিনি বলেছেন 'এবার শাশুড়ি জব্দ হলেন। বিয়ের দুইদিন পরেই নতুন বৌ চলে গেল। শুধু যাওয়াই না, বিচ্ছেদ এর জন্য পারিবারিক আইনের ৮ ধারায় উকিল নোটিশও পাঠিয়েছেন। "
আমি আবার সংবিধানে মনোযোগ দিলাম। ১২ বছর আগে আইন শাস্ত্রে ভর্তি হয়ে পরীক্ষার হলেই যেতে পারি নাই, পাশ-ফেল তো দূরের কথা! কিন্তু এবার -
" করিলাম মন শ্রী বৃন্দাবন বারেক আসিব ফিরি। "
রবীন্দ্রনাথের 'পুরাতন ভৃত্য' কবিতার কথক এর মতো মন স্থির করলাম পাশ -ফেল যা ই হউক পরীক্ষার হলে যাবোই! বুদ্ধের মতো আমিও অঙ্গীকারাবদ্ধ হলাম যে হিমালয় ভেঙ্গে পড়তে পারে, আকাশের তারকারা খসে পড়তে পারে, সমুদ্রের জল শুকিয়ে যেতে পারে, মাটি ফেটে যেতে পারে কিন্তু সংকল্পচ্যুত হবো না অর্থাৎ আমি আইন পরীক্ষার হলে যাবোই!
তাই, আবার সংবিধানের কমন প্রশ্ন তৈরী করতে গিয়ে 'হাঁ', 'না' ভোট এর বিষয়টা কি জানতে চেষ্টা করলাম। সংবিধানের আর্টিকেল ৭খ তে আছে যে সংবিধানের মৌলিক বিষয়গুলো পরিবর্তনযোগ্য না, কিন্তু তারপরে পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে অবশ্যই গণভোট নিতে হবে আর গণভোটের পদ্ধতিই হলো 'হাঁ', 'না' ভোট। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার মতো নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তো ভোটের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে দৈনিক প্রথম আলো ১২ বছর আগে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল যে জাতীয় সংসদে মাননীয় সদস্যবৃন্দ শুধু 'হাঁ', 'না' করেন। সেই 'হাঁ', 'না' যে বুঝে করেন তা ও না অর্থাৎ স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন। তাই, আমার আইন পরীক্ষার উত্তর লেখার জন্য সেই 'হাঁ', 'না' ভোটের কোয়ালিটি কি করে নিশ্চিত করা যায় সেই পয়েন্ট মনে করতে করতেই আলাপি দ্বিতীয় ভদ্র মহিলার কণ্ঠ কানে আসলো। আসলে ভদ্র মহিলাদের একটা চমৎকার গুণ দেখলাম যে অতি রূঢ় কথাও ভদ্র ভাষায় বলে দিতে পারেন, উচিত কথা মুখের উপর বলে দিতে পারে দ্বিতীয় ভদ্র মহিলা যেভাবে প্রথম ভদ্র মহিলা কে কথাটি বললেন তাকে ভদ্র ঘরোয়া আলাপচারিতায় আমরা 'পিন' মারা বলি। আমার স্ত্রীকেও দেখেছি ভদ্র ভাষায় বাহিরের লোকদের সাথে কত রূঢ় কথা বলেন। আর এগুলো বলতে না পারলে আমরা কবেই তলিয়ে যেতাম।
" ঐ মেয়েটাকে 'বেডইক্যা' বলে যে গালি দিলেন কিন্তু আপনার দেবর যে চলচ্চিত্রের কোন্ সুদর্শন পুরুষের চেয়েও 'বেডইক্যা' তা তো বললেন না। আপনার দেবর যে নিষ্কর্মার ঢেঁকি তা তো বলেন নাই। " এই বলেই দ্বিতীয় ভদ্র মহিলা ক্ষান্ত হলেন। তিনিও দেখলাম বুদ্ধের অনুশাসন মেনে চললেন, অর্থাৎ স্বলপভাষায় সব বুঝিয়ে দিলেন।
এরমধ্যে আবার মোবাইলে নোটিফিকেশন বেজে উঠলো। কালকে দেখেছিলাম যে গতকাল ছিল 'প্রাক্তন'দের শুভেচ্ছা জানানোর দিন। ভাবলাম যে কোন 'প্রাক্তন' আবার শুভেচ্ছা পাঠালো, নাকি ঘৃণা ঝেড়ে দিল, কারণ মিয়ানমারে বছর কয়েক আগে জান্তা বিরোধী নারী মিছিলে শ্লোগান উঠেছিল যে জান্তারা নাকি প্রাক্তন প্রেমিকের চেয়েও খারাপ। না, দেখলাম যে ফেস বুক পনের বছর আগের আমার এক শ্যালিকার সাথে অন্তরঙ্গ ছবি রিফ্রেস করে দিয়েছে। ফেসবুক শ্যালিকাকেও প্রাক্তন মনে করছে হয়তো, বা ছবির অন্তরঙ্গতায় হয়তো গাণিতিক probability র সূত্র ধরে fifty-fifty হতে পারে এ সমাধান ধরে ছবি দিয়ে দিয়েছে। প্রাক্তনদের জন্য রবীন্দ্রনাথ 'হঠাৎ দেখা' কবিতা লিখে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ সব কিছুতেই প্রাসঙ্গিক, তাই তাঁকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলেও তিনি বাইং মাছের মতো পিছলিয়ে চলে আসেন।
কবিতার অংশটুকুতে প্রাক্তনা বলছে প্রাক্তনকে-
"আমাদের গেছে যে দিন
একেবারেই কি গেছে -
কিছুই কি নেই বাকি?"
'চলো যাই চাংপাই' শুনে পেছনে ফিরে দেখছি কন্যা ডাকছে যে তার বান্ধবীর সাথে তার চাইনিজ নাকি জাপানিজ খেতে যাওয়ার কথা। এতক্ষণে আমার সম্বিৎ ফিরলো যে, আমি তো হেমন্তের গান শুনছিলাম আর দিবা স্বপ্ন দেখছিলাম।
লেখক: অতিরিক্ত সচিব
(লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)
স্বদেশ প্রতিদিন/ নিয়াজ