
মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে একটি ছোট দেশ—ইসরাইল। আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও শক্তি, প্রভাব ও দখলদারিত্বে বিশাল। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনের জনগণ নির্বাসিত জীবনযাপন করছে, নিজেদের ভূমিতেই পরবাসী হয়ে গেছে। তারা প্রতিদিন বোমা, গুলি আর অবরোধের মধ্যে বেঁচে থাকে। অথচ এই দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে বিশ্ব সম্প্রদায় বারবার ব্যর্থ হয়েছে। কেন ইসরাইল এত শক্তিশালী? তাকে রুখবে কে? এই প্রশ্ন শুধু ফিলিস্তিনের নয়, সমগ্র মানবতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা: অন্যায়ের বীজ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইহুদিদের ওপর হওয়া নৃশংস গণহত্যা বিশ্ববাসীকে নাড়া দিয়েছিল। সেই সহানুভূতি ও পশ্চিমা শক্তির ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ একসঙ্গে মিলে ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা তৈরি করে। ফিলিস্তিনের জমি কেটে এক ভাগ ইহুদিদের জন্য বরাদ্দ করা হয়। আরবরা এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি, কারণ এটি ছিল তাদের শতাব্দীর আবাসভূমি।
১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণা হওয়ার পরপরই আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয় এবং লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। পরবর্তী ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইল পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা, পূর্ব জেরুজালেমসহ বিশাল ভূখণ্ড দখল করে। আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ হলেও আজও সেই ভূখণ্ডের বড় অংশ ইসরাইলের দখলে। এখান থেকেই শুরু হয় দখলদারিত্বের দীর্ঘ অধ্যায়, যা আজও চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অটল মিত্রতা
ইসরাইলের শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস হলো যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সমর্থন। প্রতিবছর প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা পায় ইসরাইল। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পক্ষে বা ইসরাইলবিরোধী অধিকাংশ প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র বারবার ভেটো দিয়ে আটকে দিয়েছে। ইসরাইলের অস্ত্রশস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান আংশিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কৌশলগত স্বার্থ এবং আংশিকভাবে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইহুদি ও প্রো-ইসরাইলি লবির প্রভাবের ফল। ফলে ইসরাইলের যেকোনো আগ্রাসন প্রায়শই আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিচারহীন থেকে যায়।
সামরিক প্রযুক্তি ও কৌশলগত প্রস্তুতি
ইসরাইলের সামরিক শক্তি তুলনামূলক ছোট একটি দেশের জন্য বিস্ময়কর। তাদের আইরন ড্রোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রকেট হামলা কার্যত অকার্যকর করে দেয়।নিজস্বভাবে তৈরি যুদ্ধবিমান, ড্রোন, সাইবার যুদ্ধ প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সরঞ্জাম ইসরাইলকে প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধে অগ্রগণ্য করেছে। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থাকায় নারী-পুরুষ প্রায় সবাই প্রশিক্ষিত যোদ্ধা। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সঙ্গে গোপন সামরিক সহযোগিতা ও গোয়েন্দা বিনিময়ও ইসরাইলকে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।
এর বিপরীতে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ প্রায়ই স্থানীয়ভাবে তৈরি স্বল্প ক্ষমতাসম্পন্ন রকেট বা গেরিলা কৌশলের মধ্যে সীমিত থাকে। ফলে যুদ্ধের যেকোনো সংঘর্ষে ফিলিস্তিনিরাই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কূটনীতি ও লবিং শক্তি
সামরিক শক্তির পাশাপাশি ইসরাইল কূটনৈতিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের বড় অংশকে নিজেদের পক্ষে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য প্রভাবশালী দেশে ইহুদি লবি সক্রিয় ও শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ ইসরাইলের আখ্যান প্রচারে প্রভাব বিস্তার করে। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও চিকিৎসা খাতে ইসরাইলি কোম্পানির অবদান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে। এই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের ফলে ফিলিস্তিনের পক্ষে কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মুসলিম বিশ্বের বিভাজন
ইসরাইলের আগ্রাসনের মুখে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে মুসলিম বিশ্ব। আরব লিগ বা ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি )কখনোই ঐক্যবদ্ধ কৌশল তৈরি করতে পারেনি। কিছু আরব দেশ, যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মিসর ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। তেল ও বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিভক্ত। ফলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত কণ্ঠস্বর গড়ে ওঠেনি। এটি ইসরাইলের জন্য বড় সুবিধা।
ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ: আশার প্রদীপ
অত্যন্ত সীমিত সম্পদ নিয়েও ফিলিস্তিনি জনগণ সাত দশক ধরে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। গাজা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে প্রতিনিয়ত বিক্ষোভ, অবরোধ প্রতিরোধ এবং গেরিলা সংগ্রাম চলছে। তাদের এই সংগ্রাম বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্পৃহা এখনও নিভে যায়নি। তবু সামরিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাবে এই প্রতিরোধ আজও কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা এনে দিতে পারেনি।
বৈশ্বিক জনমত ও আন্দোলন
বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে যদিও ইসরাইলের প্রভাব শক্তিশালী, কিন্তু সাধারণ মানুষ ও নাগরিক সমাজের মধ্যে ফিলিস্তিনের জন্য সহানুভূতি বাড়ছে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকাসহ নানা দেশে ফিলিস্তিনের পক্ষে বিক্ষোভ হচ্ছে। বিডিএস আন্দোলন ইসরাইলি পণ্য ও বিনিয়োগ বর্জনের ডাক দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাব ফেলছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসনকে প্রায়শই অ্যাপারথাইড এবং যুদ্ধাপরাধ বলা হচ্ছে। যদিও এসব পদক্ষেপ এখনো বড় শক্তিগুলোর নীতি পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়নি, তবে জনমতের চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বলতা
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাব ইসরাইলকে দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে সরে যেতে এবং বসতি স্থাপন বন্ধ করতে বলেছে। তবু তা কার্যকর হয়নি। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা ইসরাইলকে শাস্তি থেকে রক্ষা করেছে।আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কয়েকটি প্রাথমিক তদন্ত শুরু করলেও কার্যকর বিচার এগোয়নি। বড় শক্তির রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই আইনি কাঠামো কার্যকর হওয়ার সুযোগ নেই।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিলিস্তিনের মুক্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন: আন্তর্জাতিক চাপ: পশ্চিমা দেশগুলোকে তাদের নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করতে বৈশ্বিক নাগরিক আন্দোলন ও বয়কট জোরদার করা দরকার।
মুসলিম বিশ্বের ঐক্য: আরব ও মুসলিম দেশগুলো যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ একত্রে সৃষ্টি করে, ইসরাইলকে আলোচনায় আনতে পারবে।
কূটনৈতিক সমাধান: দুই রাষ্ট্র সমাধান বা ন্যায্য সমঝোতার পথ খোলা রাখতে হবে।
মানবিক সহায়তা: গাজার অবরোধ ভেঙে আন্তর্জাতিক সাহায্য পৌঁছানো জরুরি।
বিশ্ব বিবেকের সামনে কঠিন প্রশ্ন
ইসরাইলের শক্তির পেছনে কেবল অস্ত্র বা প্রযুক্তি নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল বাস্তবতা এবং মুসলিম বিশ্বের অক্ষম ঐক্যও দায়ী। ফিলিস্তিনের দুঃখজনক ইতিহাস শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ইস্যু নয়, এটি মানবতার পরীক্ষাও বটে।
বিশ্ব যদি সত্যিই ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, তবে নীরবতা আর চলতে পারে না। যুদ্ধ ও দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে বৈশ্বিক জনমত, রাজনৈতিক সাহস এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার দরকার।
ফিলিস্তিনের নারী শিশুর রক্তাক্ত লাশের স্তুপ, চোখের জল, অসহায় গাজা কিংবা পশ্চিম তীরের অবরুদ্ধ শহরগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অন্যায় যদি প্রতিরোধ না হয়, তাহলে তা শুধু একটি অঞ্চলের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের শান্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
স্বদেশ প্রতিদিন/কেআইকে