
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ ৭ বছর পর ১৯৭৮ সালে, তৎকালীন সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আগ্রহে। ৭১’র গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দলের অস্তিত্বই ছিল না। তাই দলীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক কোন অভিজ্ঞতা, পক্ষ-বিপক্ষের নানা কাহন, এই দলের থাকার কথা নয়। দলের প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানও দলের প্রাথমিক গঠনকাল থেকেই মনোযোগী ছিলেন একটি সর্বজনগ্রাহ্য ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যের প্রতি। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশকে আমাদের শত্রুরা ভয় পায়- এই কথা শহীদ জিয়া বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি দল মত নির্বিশেষে একটি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী বাংলাদেশ রাষ্ট্র, যা মুসলিম জাতীয়তাবাদের পরিচয়ে গর্বিত হবে, গঠন করার জন্য জাতিকে প্রণোদিত করেছিলেন।
সর্বস্তরের জনগণ শহীদ জিয়ার এই দৃষ্টিভঙ্গি ও এজেন্ডাকে পছন্দ করেছিল এবং পূর্বের কোন রাজনৈতিক পরিচয়হীন একজন মুক্তিযুদ্ধকালীন বীর সেনানীর পেছনে একত্রিত হয়েছিল, গভীর শ্রদ্ধায় এবং ভালোবাসায়। একনায়ক শেখ মুজিবের একদলীয় দুঃশাসনকে মিটিয়ে দিয়ে জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের জনগণকে বহুদলীয় গণতন্ত্র উপহার দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারত সম্পর্কে ইতোমধ্যে এদেশের জনগণের বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছিল। ভারতের চাপিয়ে দেওয়া ক্রমাগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এদেশের জনগণ পছন্দ করেনি। তাই ভারতীয় হেজিমনির (দাদাগিরি)’র বিরুদ্ধে শহীদ জিয়া আবির্ভূত হয়েছিলেন ত্রাণকর্তা হিসেবে। স্বাভাবিকভাবেই স্বৈরাচার শেখ মুজিবের সকল অপকর্মকে সহযোগিতা ও সমর্থনকারী ভারত মেজর জেনারেল জিয়ার এই উত্থানকে পছন্দ করেনি।
রাজনৈতিক উদারতায় প্রেসিডেন্ট জিয়া জনরোষে নিহত স্বৈরশাসক শেখ মুজিবের কন্যাকে দেশে ফিরে আসার এবং শেখ মুজিব কর্তৃক বাতিল করা আওয়ামী লীগকে পুনরায় উজ্জীবিত করার সুযোগ দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই ভারতপন্থী কিছু বিপথগামী সেনা অফিসারের হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হন। অনেকে দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’র হাত।
আমার জানামতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুইজন সেনা অফিসার ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং শেখ হাসিনার আমলে দেশে ফিরে আসেন। না, তাদের কোন বিচার হয়নি। শহীদ জিয়ার নামাজে জানাজায় এদেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ সংখ্যক জনগণ অংশগ্রহণ করে এবং আকস্মিক এই ঘটনায় বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের মনের ভেতর ভারতের বিরুদ্ধে উত্তাপ। পরবর্তী সময়ে ভারত পুণরায় আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে খেলতে শুরু করে।
বিগত কয়েক দশক ধরে মিথ্যুক, খ্যাপা, মানসিক রোগগ্রস্ত, অহংকারী শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচারী এবং খুনী হয়ে ওঠার সকল কাজে সার্বিক সহযোগিতা জুগিয়েছে ভারত এবং ফল হিসেবে চুষে খেয়েছে বাংলাদেশকে নানা ভাবে। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত ও দলীয়ভাবে দেশের অর্থ ও সম্পদ লুটপাট করেছে। আর অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামগ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” শব্দমালার অপব্যবহার করে সে এই দেশে জনগণের মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য জাগিয়ে রেখেছে এবং মারামারি হানাহানিকে প্রশ্রয় দিয়েছে। নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে ইসলাম প্রীতি ও ইসলামী জীবনবোধকে “মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ” আখ্যায়িত করে অসংখ্য মানুষের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়েছে। স্বৈরাচারী শাসন কায়েম রাখার জন্য এন্তার খুন এবং গুম করে অসংখ্য মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা ছাত্র-জনতার ভয়ে ৫ই আগস্ট ২০২৪ তারিখে খুনি হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং ভারত তাকে আশ্রয় দেয়। বাংলাদেশের আপামর জনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ভারত পলাতক স্বৈরাচারকে এখনো আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।
স্বৈরাচারের পলায়ন পরবর্তী সরকারবিহীন কয়দিন রক্তপাতহীন ভাবে জীবন-যাপনের পর বাংলাদেশের বিধ্বস্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থার হাল ধরেছে একটি দুর্বল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাজুক অবস্থা, বিধ্বস্ত অর্থব্যবস্থা এবং কাজে যোগ দেয়া আমলাদের ‘নিজের প্রমোশন’ নিয়ে ব্যস্ততা দেখে জনগণ হতাশ হতে শুরু করে। আগের প্রেসিডেন্ট, আগের সংবিধান এবং আগের সেনাপ্রধান পরিবর্তনের পথে বাধা জনগণের কাছে বিএনপির সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অথচ জনগণ আশা করেছিল জাতির এই সঙ্কটকালে বিএনপি ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হবে। জনগণ আরো হতাশ হলো যখন দেখা গেল ভারতের আশা আকাঙ্ক্ষা বিএনপির কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে!
মাত্র ১৩ মাস যেতে না যেতেই রাজনীতিতে দূষিত অনৈক্য এবং দোষারোপের কালচার শুরু হয়ে গেছে। যে সকল রাজনৈতিক দলের আপাতঃ ঐক্যে স্বৈরাচার হটানোর মতো অসম্ভবকে সম্ভব করা গিয়েছিল সেই ঐক্য এখন স্পষ্টতই ভেঙে পড়েছে এবং যে যার মতো করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। বর্তমানের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে মনে হচ্ছে ‘তারা ইতোমধ্যে ক্ষমতায় চলে গেছে’ এবং তাদের নেতাকর্মীদের নিত্যনৈমিত্তিক চাঁদাবাজি দখলদারির গল্প চতুর্দিকে চাক্ষুষ হচ্ছে।
দোষারোপের রাজনীতিতে অবতীর্ণ হয়ে বর্তমান বিএনপির অতীত-মুখিতা, রাজাকার বা পাকিস্তানি ট্যাগ দেয়া এবং জুলাই-প্রত্যাখানের রাজনীতি বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম পছন্দ করছে না। প্রত্যাখানের লক্ষণ নানাভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।
বিএনপি ‘নেতৃত্ব’ বোঝে বলে মনে হয় না। যে বর্তমান বিএনপির প্রতি জনগণের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কারণে যেটুকু আন্তরিকতা মানুষের ছিল তা বর্তমান বিএনপি ধারণ করে না, তাদের দলীয় নীতির সাম্প্রতিক বাঁক বদলের জন্য। আরো স্পষ্ট করে বললে, তাদের ভারতমুখী নীতির জন্য।
শহীদ জিয়া ছিলেন বাংলাদেশী, আর এরা হয়ে গেছে বাঙালি! শহীদ জিয়া ইসলামী মূল্যবোধকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন, আর বর্তমান বিএনপি জনগণের ইসলাম-প্রীতিকে “মৌলবাদ” অভিধায় সনাক্ত করে তা উৎখাতের শপথ নিয়েছে। এধরনের সস্তা রাজনীতি জনগণের পছন্দের বৃত্তের বাইরে- এ কথাও বর্তমান বিএনপি বোঝে বলে মনে হয় না।
ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়গুলোতে বিএনপি ইদানিং হোঁচট খাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই। যেমন, ভারত পাকিস্তানকে অপছন্দ এবং ঘৃণা করে বলেই আমাদেরকেও ভারতের সাথে সুর মিলিয়ে পাকিস্তানসহ ভারত-অপছন্দের রাষ্ট্রগুলোর সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করতে হবে এবং সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে, ভূরাজনৈতিক বিচারে সেটা মূর্খতার শামিল। ভূরাজনীতির আঙ্গিনায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টি একটি অতি প্রয়োজনীয় ব্যালেন্সিং ফ্যাক্টর। পাকিস্তান, তুরস্ক, ইরান ও মালয়েশিয়ার সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন হলোঃ এই নাজুক সময়ে এসে পাকিস্তান কেন আমাদের আভ্যন্তরীণ ঐক্যের বিপক্ষে ফেক্টর হবে? ভারত চায় বলে? ভারতের কাছে আমরা কি এতটাই নিরাপদ! বিগত ৫৪ বছরে ভারতের দানবীয় বন্ধুত্বের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেও কি আমাদের শিক্ষা নিতে নেই?
জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারত, ভারতীয় পণ্য, ভারতপন্থী রাজনীতি এবং ভারতীয় হেজিমনিকে প্রত্যাখান করেছে। এসব যারা বাংলাদেশের মানুষকে খাওয়াতে চাইবে তাদেরকেও আমজনতা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে। বিষয়টা অত্যন্ত সোজাসাপ্টা। আগেভাগেই বিষয়টি অনুধাবন করে সচেতন হওয়া সকলের জন্য মঙ্গল বলে মনে করি।
লেখাঃ শিক্ষাবিদ, কবি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।