
দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনটি বেশির ভাগ সময় আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপটে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। প্রকাশ্যে এবং ভেতরে সম্ভাব্য প্রার্থী অনেক। প্রার্থীরা সভা-সমাবেশ ছাড়াও এলাকায় বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সখ্য তৈরিতে তৎপর। এই আসনে যে দল যাকেই মনোনয়ন দিক না কেন লড়াইটা হবে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে। তবে বিএনপির একাধিক প্রার্থী ও নিজেদের মধ্যে অন্তঃকলহের কারণে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে বহিরাগত প্রার্থীর নামও শোনা যাচ্ছে। থাকবে স্বতন্ত্র প্রার্থীও। তবে এখন পর্যন্ত এনসিপির প্রার্থীর কোন নাম শোনা যায়নি।
১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত দিনাজপুর-১ আসনে এবার নতুন ভোটার হয়েছে ২০ হাজার ৬১১। যার মধ্যে বীরগঞ্জে ১৪ হাজার ৪৩৯ ও কাহারোলে ৬ হাজার ১৭২। মোট ৪ লাখ ১৯ হাজার ১০০ ভোটারের মধ্যে বীরগঞ্জে ২ লাখ ৭৯ হাজার ১৭৪ ও কাহারোলে ১ লাখ ৩৯ হাজার ১২৬ ভোটার আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন বলে দিনাজপুর নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে।
১৯৮৬ সাল থেকে এ আসনটিতে আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি একবার এবং জামায়াত ও জাতীয় পার্টি একবার করে এবং সর্বশেষ আওয়ামী লীগ (স্বতন্ত্র) একবার জয়লাভ করে।
বিএনপির দলীয় কোন্দলের কারণে যেই মনোনয়ন পাক না কেন, সে কারণে বিএনপি প্রার্থীর জয় পাওয়া কষ্টকর হবে। বীরগঞ্জ ও কাহারোল ২ উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত দিনাজপুর-১ আসনটিতে সংখ্যালঘু ভোটার একটা বড় ফ্যাক্টর। এই আসনে ৪২ শতাংশ ভোটার সনাতন ধর্মাবলম্বী বা সংখ্যালঘু। তাই প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও মাথায় রাখছে বিএনপি। এক্ষেত্রে বহিরাগত প্রার্থীরও নাম শোনা যাচ্ছে। কিন্তু প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে জামায়াত রয়েছে এগিয়ে। তাদের প্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে প্রার্থী দেওয়া নিয়েও মেরুকরণে পরিবর্তনের তথ্য বেরিয়ে আসছে। তৃণমূলের অনেকেই মনে করেন, বিএনপির দলীয় কোন্দলের কারণে যেই মনোনয়ন পাক না কেন, একজনের অনুসারী পরস্পরের বিরোধিতা করবে বলে বিজ্ঞ মহল মত পোষন করছেন। তবে জাতীয় পার্টির কোনো কাঠামো নেই বললেই চলে। জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিলে তাদের প্রার্থী রয়েছে। বাম ও ইসলামি এবং নতুন নতুন দলগুলোর প্রার্থী কিংবা নেতাকর্মীদের কোনো সাড়াশব্দ শোনা যাচ্ছে না। তবে এখানে লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই।
আসনটিতে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু, সাধারণ সম্পাদক আলহাজ জাকির হোসেন ধলু, বিএনপি নেতা কাহারোল উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ চৌধুরী। এছাড়া সেখানে বিএনপির অন্তঃকোন্দল ও সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি বড় অংশ থাকায় দলীয়ভাবে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি সত্যজিত কুমার কুন্ডুর নামও মনোনয়নের বিবেচনায় রয়েছে বিএনপিতে।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আসনটি আবার পেতে চায় জামায়াত। কারণ হিসেবে দেখা দেয়, ইতোপূর্বে জামায়াত এই আসনে আব্দুল্লাহ আল কাফি সংসদ সদস্য নির্বাচিত এবং তাদের পৌর মেয়র হিসেবে মোহাম্মদ হানিফ নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্বাচনে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তরের শুরা সদস্য, তুরাগ থানার আমির, দিনাজপুর শহর শিবিরের সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান। গত ৪ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের রোকনদের এক আলোচনা সভায় তার নাম ঘোষণা করা হয়। একক প্রার্থী হওয়ায় নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই আসনের ভোটাররা বরাবরই বহিরাগত প্রার্থীর ক্ষেত্রে বিপ্লবী। এই সুযোগ কাজে লাগান মনোনয়ন বঞ্চিতরা। এর একাধিক নজির রয়েছে এই আসনে।
এছাড়া এখানে প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন বীরগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহিনুর ইসলাম। দলীয় সিদ্ধান্ত হলে তিনি এবারও প্রার্থী হবেন বলে জানা গেছে।
কথা হয় জামায়াত প্রার্থী মতিউর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, আমি জামায়াত ইসলামের একক ঘোষিত প্রার্থী। জামায়াত একটি সুশৃংখল দল। আমরা আশা করছি যেভাবে আমাদের নেতাকর্মীরা নিজ দায়িত্বে গণসংযোগ করছে এবং আমি নিজে মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি তাতে বোঝা যাচ্ছে ভোটার আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট। ইতিপূর্বে এই আসনে আমরা একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলাম এবং বীরগঞ্জ পৌর মেয়রের পদে জয় লাভ করেছিলাম। তাই এইবারও আমরা আশাবাদী। আমি নির্বাচিত হলে এলাকার নারীদের উন্নয়ন, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজীর বিরুদ্ধে কাজ করব। পাশাপাশি বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ২০০ শয্যায় উন্নীতসহ সকল প্রকার উন্নয়নে কাজ করব।
অপরদিকে বীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, গত কয়েক বছরে এই আসনের এমপি লোক দেখানো কাজ করেছে। কাজ হয়েছে কম দুর্নীতি হয়েছে বেশি। আমি যদি এই আসনের মনোনয়ন পাই এবং নির্বাচিত হই, তাহলে এলাকার মানুষের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাবো। দুর্নীতিকে মোটেও প্রশ্রয় দিব না। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা, বীরগঞ্জ হাসপাতালকে ২০০ শয্যায় উন্নীতসহ সকল উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাব। তিনি বলেন, দলীয় কোন ভেদাভেদ আমাদের মধ্যে নেই। যাকে মনোনয়ন দেয়া হোক, একযোগে কাজ করে যাব। আর মনোনয়ন পেলে জয়ের ব্যাপারে আমি পুরোপুরি আশাবাদী।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ