
২০১৭-১৮ সাল বোধহয়। তখনও মাস্টারির স্বপ্ন বুকে পুষে জীবনধারণের জন্য এনজিও আর মিডিয়ায় যুগপৎভাবে কামলা দেই। কদিন আগেই নিজের বিভাগে মাস্টারির ভাইভা নামক বেহুদা আলাপচারিতায় সময় নষ্ট করে আসছি।
এর কিছুদিন পর, জাহাঙ্গীরনগরে তখন পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেট্রিক্সে শিক্ষক নিয়োগ দিবে। নৃবিজ্ঞান গ্র্যাজুয়েটরাও অ্যাপ্লাই করতে পারবে। অ্যাপ্লাই করে দিলাম, যথারীতি ইন্টারভিউতে কলও পেলাম। দিনভর বসে থেকে লাঞ্চের পর বোর্ডে ডাক আসলো।
ভিসির রুমে বোর্ড বসেছে। ভিসি, সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ার আর বিএসএমএমইউ-এর তৎকালীন প্রোভিসি প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিবেন।
সাক্ষাৎকার শুরু হলো হালকা চালে। পরিচয়পর্বের পর এই সেই আলাপচারিতা শেষে প্রশ্ন শুরু করলেন সেই প্রোভিসি মহোদয়।
-‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়েছেন?’
-‘জ্বি।’ (বইটা কোনো এক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকেই ভাত খাওয়ার সময় বই পড়ার অভ্যাস থেকে এই বইটাও কয়েক পৃষ্ঠা করে পড়তে পড়তে বোধহয় ৪০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়া হয়েছিলো তখন। সেই ভরসা থেকেই জ্বি বলেছিলাম)।
-‘বলেন তো, বঙ্গবন্ধুর ছোটবেলায় একটা অসুখ হয়েছিলো, সেটা কি?’
-‘বেরিবেরি।’ (সম্ভবত বইটার ৮/৯ পৃষ্ঠায় এটা উল্লেখ ছিলো)।
-তার তখন কত বছর বয়স ছিলো?
-সম্ভবত ১৪/১৫ বছর স্যার।
-গুড, আচ্ছা বলেন তো, তিনি এই রোগের চিকিৎসা কোথায় করিয়েছিলেন?
-কোলকাতায়।
-ভেরি গুড। বলেন তো, এর পরপরই তার আরেকটা রোগ হয়েছিলো। সেটা কি?
-‘গ্লুকোমা, স্যার।’
-এটা কত বছর বয়সে হয়েছিলো?
-১৬/১৭ বছর বয়সে বোধহয়, স্যার। (যেহেতু জানতাম, তিনি ১৯২০ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তার এসব অসুখ ধরা পরে ১৯৩৪-১৯৩৮ সালের মধ্যে তাই আনুমানিকভাবে বয়স বলছিলাম।
-বাহ্! চমৎকার। তিনি গ্লুকোমার চিকিৎসা কোথায় করিয়েছিলেন?
-জ্বি স্যার। কোলকাতাতেই।
-ওকে। এবার বলেন তো, বেরিবেরি রোগ কেনো হয়?
-ভিটামিনের অভাবে, স্যার।
-কোন ভিটামিন?
-স্যার, ভিটামিন বি অথবা ডি এর অভাবে।
-ঠিক করে বলেন, কোনটা?
ততক্ষণে অলরেডি মেজাজ খারাপ হতে শুরু করেছে। আসছি পাবলিক হেলথে নৃবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টারির পরীক্ষা দিতে। আর আমাকে কিনা অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিয়ে প্রশ্ন করতেছে? তাও আবার একটাও নৃবিজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন না করে! তাই সোজা উত্তর না দিয়ে, একটু মিষ্টি হেসে ত্যাড়াভাবেই বললাম।
-স্যার, এটা তো ক্লাস ফাইভের বইয়ে পড়েছিলাম। এই মূহুর্তে ঠিক মনে পড়ছে না কোন ভিটামিন। তবে সম্ভবত ভিটামিন বি-ই হবে।
দেখলাম, তারা একটু নিজেদের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। তারপর সেই দলীয় প্রোভিসি বললেন, আচ্ছা! ঠিক আছে। আমার প্রশ্ন শেষ। আপনারা যদি কিছু জানতে চান, বলেন?
এবার তৎকালীন জাবি ভিসি, শিক্ষার্থীদের ‘প্রিয় আম্মো’ ড. ফারজানা ইসলাম আমাকে বললেন, “তোমাকে তো জাফর আমি ফার্স্ট ইয়ার থেকেই জানি। তুমি কি করেছো, তোমার রেজাল্ট, সবই তো আমার জানা। তোমাকে আর কি জিজ্ঞাসা করবো? কিন্তু তুমি বেরিবেরি কোন ভিটামিনের অভাবে হয়, এটা বলতে পারলে না?”
আমি তখন বললাম, “ম্যাম, আমি তো নৃবিজ্ঞানের প্রার্থী হিসেবে ভাইভা দিচ্ছি। আমাকে তো আপনারা আমার ডিসিপ্লিনের কোনো প্রশ্ন করলেন না! আর বেরিবেরি কোন ভিটামিনের অভাবে হয়, সেটা আমি জানলেও এখন অ্যাকজ্যাক্টলি মনে করতে পারছি না। বি অথবা ডি, এই দুটোর একটার অভাবেই হবে, এটা আমি শিওর।”
এরপর ভিসি মহোদয় সবার দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে বললেন, “আচ্ছা বলো, তোমার থিসিসের বিষয় কি ছিলো? মেথডোলজিটা একটু বলো।”
আমি সবটা ঠিকঠাকভাবে উত্তর দিলাম। থিসিসে যে আমি এ প্লাস পেয়েছিলাম, সেটাও জানালাম। সব শুনে তিনি আমাকে বাহ্ বাহ্ করতে করতে বললেন, “ঠিক আছে জাফর। যাও তাহলে। আমাদের আর কিছু জানার নেই।”
ওই ভাইভা দিয়ে বের হয়েই বুঝতে পারছিলাম, চাকরিটা আমার হবে না। কারণ পাবলিক হেলথের ভাইভায় যে সমস্ত বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন করতে হয়, সেগুলো না করে, এমন জায়গা থেকে প্রশ্ন শুরু করার অর্থই হলো, তারা কি চায়, সেটা বুঝিয়ে দেওয়া। তারা আসলে চেয়েছিলো, তাদের একান্ত বাধ্যগত্য এবং মননে না হলেও প্রকাশ্যে আপোষহীন আওয়ামীলীগ। কিন্তু আমার কথায় সেগুলো প্রকাশ পায় নি। উল্টো আমি তাদের প্রশ্ন করার ধরণ ও প্রশ্নের ধরণ যে আমার পছন্দ হচ্ছে না, সেটা প্রকাশ করে ফেলেছি।
পরে শুনলাম, ঠিক তাই! চাকরিটা আমার হয় নি। যার হয়েছে, তার ব্যাপারে আমার কোনো উচ্চ বা নিম্ন কোনো মন্তব্যই নাই। কিন্তু আমার হয় নি। এখান-সেখান থেকে শুনলাম কেনো হয় নি। কেনো, জানেন?
কারণ আমি বঙ্গবন্ধুর বেরিবেরি রোগ কোন ভিটামিনের অভাবে হয়েছিলো, সেটি নাকি সঠিকভাবে বলতে পারি নি। এই প্রশ্নের উত্তরটা পারলেই নাকি তারা আমাকে পাবলিক হেলথের শিক্ষক হিসেবে নিয়ে নিতেন।
শুনে আমি শুধু হাসলাম, আর হাসলাম। আর মনে মনে বললাম, আহা, অসমাপ্ত আত্মজীবনী! তুমি এখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের ভাইভার মূল প্রশ্ন! কি সৌভাগ্য তোমার!
লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক