
মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে লাখ লাখ বাংলাদেশি শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেন। এই শরণার্থীদের মধ্যে ছিলেন দেশের শিল্পী সমাজের কিছু সদস্য, যারা প্রধানত কলকাতায় অবস্থান করেন। সেই সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন জহির রায়হান, সৈয়দ হাসান ইমাম ও কয়েকজন। তাঁদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তথ্যচিত্র, যা হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার প্রামাণ্য দলিল।
১৯৭১ সালের মে মাসের শেষ দিকে জহির রায়হান বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী ও কুশলী সমিতি গঠন করেন। সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব বাংলার চলচ্চিত্রশিল্পী ও কলাকুশলীদের খাদ্য, বাসস্থান ও মাসিক ভাতা নিশ্চিত করা। সংগঠনটি পরিচালিত হয় জহির রায়হানের সভাপতিত্বে, সৈয়দ হাসান ইমাম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে, এবং অন্যান্য সদস্যদের সহায়তায়।
সমিতির শিল্পীরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগীত, নাটিকা, একাঙ্কিকা, বিক্ষোভ মিছিল এবং বেতার অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। সেই সময় অনেকেই কলকাতার চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। উল্লেখযোগ্য শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন জহির রায়হান, আলমগীর কবির, বাবুল চৌধুরী, উদয়ন চৌধুরী, নারায়ণ ঘোষ মিতা, আজমল হুদা মিঠু, সুভাষ দত্ত, সৈয়দ হাসান ইমাম, কবরী, সুমিতা দেবী প্রমুখ।
চলচ্চিত্র শিল্পী ও কুশলী সমিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চারটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ।
এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হল ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা ১৯৭১ সালের আগস্টে তৈরি হয়ে সেপ্টেম্বরেই মুক্তি পায়। এটি পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রমাণ হিসেবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং দেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রায় অর্ধেক নাগরিকদের কাছে এটি যেন রাইফেল হিসেবে কাজ করেছে।
তথ্যচিত্রগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
• ‘স্টপ জেনোসাইড’ – চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: জহির রায়হান
• পরিকল্পিত অন্যান্য তথ্যচিত্র:
• ‘অন দ্য ফ্রিডম ফাইটার্স’
• ‘অন শেখ মুজিবুর রহমান’
• ‘অন দ্য লিডার্স অব দ্য লিবারেশন মুভমেন্ট’
• ‘টু মিলিয়ন ট্রেইটরস’
• ‘লাইফ ইন লিবারেটেড এরিয়াজ অ্যান্ড অকুপাইড জোনস’
• কাহিনিচিত্র: ‘বার্থ অব আ নেশন’
প্রবাসী মুজিবনগর সরকার জহির রায়হানকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তিনটি প্রামাণ্যচিত্রের জন্য ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে জহির রায়হান, আলমগীর কবির ও বাবুল চৌধুরী আরও তিনটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। উল্লেখযোগ্য প্রামাণ্যচিত্রগুলো হলো:
• ‘আ স্টেট ইজ বর্ন’ – পরিচালনা: জহির রায়হান
• ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ – পরিচালনা: আলমগীর কবির
• ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’ – পরিচালনা: বাবুল চৌধুরী
এই চলচ্চিত্রগুলোর চিত্রগ্রাহক ছিলেন অরুণ রায় ও সাধন রায়, সম্পাদনায় দেবব্রত সেনগুপ্ত, এবং ব্যবস্থাপনায় চিত্ত বর্ধন সহ আরও অনেক শিল্পী।
বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে ‘স্টপ জেনোসাইড’, ‘আ স্টেট ইজ বর্ন’ ও ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’ এর ডিজিটাল সংস্করণ। তবে ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ ফিল্ম আর্কাইভে নেই।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নাল (২০২১) – মীর শামসুল আলম বাবু, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে চলচ্চিত্র শিল্পী ও কলাকুশলীদের ভূমিকা।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ