
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মেয়ে নুরুল ইজ্জাহ আনোয়ার বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
রবিবার (২৭ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে জুলাই বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত "প্রথম জুলাই বিপ্লব আন্তর্জাতিক সম্মেলনের" দ্বিতীয় সেশনে এ মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মার সভাপতিত্বে সম্মেলনের দ্বিতীয় সেশনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কোস্টারিকার ইউনিভার্সিটি ফর পিস এর ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. আমর আব্দুল্লাহ, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. লুৎফে সিদ্দিকী, তুরষ্কের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইয়াসিন আখতাই, জাগরণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শরীফ বান্না, সিঙ্গাপুরের নায়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাইদুল ইসলাম, বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইয়েদা সুলতানা রাজিয়া এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম কবিরুল ইসলাম।
নুরুল ইজ্জাহ আনোয়ার তার বক্তব্যের শুরুতে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির জন্য শোক প্রকাশ করে বলেন, প্রত্যেকটা বিপ্লবেই অনেকগুলো প্রেক্ষাপট থাকে। কেবল একটা ঘটনা কোন বিপ্লব ঘটাতে পারে না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেবল একটা আন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল জাতির নতুন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সূচনা।
তিনি আরও বলেন, আমি দেখছি বাংলাদেশ একটি সংকটময় সময় পার করছে। একটা বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এটা একটা কমন সমস্যা। সম্মিলিতভাবে এ অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে হবে।
জাগরণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শরীফ বান্না বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন তা একটা গোষ্ঠীর কাঠে কুক্ষিগত ছিলো। বহুদিন ধরেই এই ভুখন্ডের মানুষের মুক্তির যে সংগ্রাম, জুলাই বিপ্লব ছিলো তার সর্বশেষ সংযোজন। আমাদের কর্তব্য এখন শুধু জুলাইয়ের শহিদসের সম্মান জানানোতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা নতুন যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল তা বিনির্মানে সর্বাত্মক কাজ করা।
তিনি তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা দেশকে মুক্ত করেছ। তোমরা দুর্নীতি ও কোন অন্যায়ের সাথে আপোষ করবে না। তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মানে কাজ করবে।
প্রফেসর ড. ইয়াসিন আখতাই বলেন, গনতন্ত্র আর ইসলামকে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে ইসলামের সাথে সবচেয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ শাসনব্যবস্থা হচ্ছে গনতন্ত্র। যে কারণে ইজরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে হুমকি মনে করে। তাই তারা মিশরে মো. মুরসির শাসনকে মেনে নিতে পারেনি। তুরস্কে আমরা গনতান্ত্রিক উন্নয়নকে সবসময় স্বাগত জানিয়ে আসছি।
সভাপতির বক্তব্যে ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, ২০২৪ এর জুলাইয়ে জনগণ একটা পরিবর্তন চেয়েছিল, তারা একটা নতুন বাংলাদেশ চেয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের বহিঃপ্রকাশ। তরুণরা সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিলো।
তিনি বলেন, আমি মনে করি তরুণদের সামর্থ্যকে ব্যবহার করার জন্য বাংলাদেশের জন্য এটাই সেরা সুযোগ। আমাদের তরুণরা খুবই মেধাবী। তাদের এই মেধাকে লাজে লাগাতে হলে তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। এই জায়গা থেকে তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ঢাবি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা যদি আমাদের তরুণদের ক্ষমতায়ন করতে পারি এবং তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে আমরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি তা বাস্তবায়ন অনেকটাই সহজতর হবে।
এর আগে সম্মেলনের প্রথম সেশনে ঢাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন শিল্প, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। এসময় আরও বক্তব্য রাখেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান, আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিবিদ জন এফ. ডেনিলোইজ প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, আমরা আজ যে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনের পতন দেখেছি, সেটার নিষ্ঠুরতা আমাদের বিবেককে সামগ্রিকভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। এই শাসনব্যবস্থা রাষ্ট্রকে জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্রে পরিণত করেছিল। শুধু তাই নয় র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সন্ত্রাসের হাতিয়ার বানানো হয়েছিল। গুম-খুন হয়ে উঠেছিল নিত্যদিনের ঘটনা। কবি, শিক্ষক, সাংবাদিক ও ছাত্রনেতাদেরকে 'অপরাধী' হিসেবে জেলে ভরা হয়েছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মুক্ত চিন্তায় বাঁধা দেওয়া হতো।
জুলাই বিপ্লবের প্রথম আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনকে শুধু আলোচনা নয়, বরং একটি 'সাক্ষ্য প্রমাণে'র প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা বিকৃত ইতিহাস থেকে সত্যকে উদ্ধার করতে চাই। যারা নিখোঁজ হয়েছেন, তাদের পরিবারদের কান্না, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে গেঁথে থাকা গুলির চিহ্ন—এসবই একদিন ন্যায়বিচারের নির্মাণকাজে প্রমাণ হয়ে উঠবে।
আমেরিকার স্ট্যাস্ট ডিপার্টমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিবিদ জন এফ. ডেনিলোইজ বলেন, জুলাই বিপ্লব কোনো বিদেশী শক্তি বা গভীর রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের ফল নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের মানুষের নিজস্ব সংগ্রামের ফসল। ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীদের কাছে প্রমাণ দেয়া কঠিন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশ এতে জড়িত ছিল না। আজ পর্যন্ত আমি এমন কোনো প্রমাণ দেখিনি। যদি এমন কোনো প্রমাণ কারো কাছে থাকে আমি সেটা দেখাতে চ্যালেঞ্জ করছি। তিনি আরো বলেন, বিপ্লব সফল হওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অস্থিতিশীলতা পরিবেশ ও তথ্য যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে যা এখনও চলমান রয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকারকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৪০০ টি প্রবন্ধ জমা পড়ে। এরমধ্যে ৬০টি প্রবন্ধ মৌখিক উপস্থাপনের জন্য ৬০টি পোস্টারকে মনোনীত করা হয়েছে।
সম্মেলন শেষে টিএসসি অডিটোরিয়ামে 'লাল জুলাই' নামক একটি মঞ্চ নাটক পরিবেশন করা হয়। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ