
উগান্ডার সোরোটি জেলার ওমালেরা গ্রামে ১৭ বছরের নোয়া ওয়ারা—যিনি হাইড্রোসেফালাসে আক্রান্ত এবং পা দুটো ব্যবহার করতে পারেন না—তাঁর গায়ে উদ্ভিজ্জ উপাদান ও পানি দিয়ে তৈরি একটি মিশ্রণ ঘষে দিচ্ছেন স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসক রবার্ট আপেদু।
উগান্ডার জিনজা জেলার একটি কাদামাটির রাস্তার পাশে, সবুজ টিলা ও আখের খেতঘেরা একটি নিরিবিলি প্রাঙ্গণে কিশোর-কিশোরীদের হাসি-আনন্দে মুখর পরিবেশ। কেউ হুইলচেয়ারে চড়ে দৌড়াচ্ছে, কেউ খেলছে দাবা। এই চিত্র দেখে বোঝার উপায় নেই—এখানে থাকা ৯৮ জন শিশুই কোনো না কোনোভাবে পরিত্যক্ত, যাদের অনেকেই জন্মের পরপরই ফেলে যাওয়া হয়েছিল।
শিশুগুলোর বয়স ছয় মাস থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত। কেউকে হাসপাতালের গেটে ফেলে যাওয়া হয়েছিল, কেউ compound-এর সামনেই পড়ে ছিল, আবার এক শিশুকে ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়, তার বাবা-মা নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন পর।
উগান্ডার প্রায় পাঁচ কোটির জনসংখ্যার মধ্যে ৬০ লাখেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বসবাস করেন। অনেকেরই বিশ্বাস, প্রতিবন্ধিতা হলো অভিশাপ। এই কুসংস্কার থেকে পরিবারগুলো সন্তানদের লুকিয়ে রাখে, বেঁধে রাখে বা একঘরে করে রাখে। কখনও কখনও এই সামাজিক কলঙ্কের ভার ও আর্থিক সংকটের কারণে শিশুদের পরিত্যাগ করে দেওয়া হয়। প্রতিবন্ধী পরিবারের ৩১ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।
সরকারি বাজেটের মাত্র ১ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। “এটা খুবই নগণ্য,” বলেন দেশটির সহকারী কমিশনার ফর ডিসঅ্যাবিলিটি, অ্যান্ড্রু মুবানগিজি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর অপ্রতুল জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে অনেক অভিভাবককে বহু দূরে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়।
এই বাস্তবতায় গত দুই দশক ধরে কিছু ছোট ছোট দাতাসংস্থার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান, যারা অসহায় প্রতিবন্ধীদের জন্য সহায়তা ও আশ্রয়ের কাজ করছে।
এমনই একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এডিথ লুকাব্বে, যিনি নিজের গড়ে তোলা ‘হোম অব হোপ’ শিশু আশ্রমে ৯৮ জন শিশুর দেখভাল করছেন। তাঁর লক্ষ্য, স্থানীয় সমাজকে সচেতন করে সংস্কার ভাঙা ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ গড়ে তোলা। “মানুষকে বুঝাতে হবে—এটা কোনো অভিশাপ নয়,” বলেন তিনি।
‘সমাজে ঠেলে ফেলা হয়’
জিনজা জেলার বুগেম্বেতে অবস্থিত ‘হোম অব হোপ’-এ প্রতি মঙ্গলবার আয়োজন করা হয় থেরাপি ডে। সেদিন আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় ২৫ জন অভিভাবক তাঁদের প্রতিবন্ধী সন্তানদের নিয়ে আসেন ফিজিওথেরাপি ও অকুপেশনাল থেরাপির জন্য। এখানকার প্রধান থেরাপিস্ট এডি ওপিও Mildred নামের দুই বছরের ডাউন সিনড্রোম আক্রান্ত শিশুটিকে দেখে দিকনির্দেশনা দেন, যাকে ধরে ধরে হাঁটা শেখাচ্ছেন মা ইদা।
এই দিনটি শুধু চিকিৎসার জন্য নয়, বরং অভিভাবকদের একে অপরের সঙ্গে কথা বলার ও মানসিক সমর্থন পাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করে দেয়।
একদিন, বৃষ্টিভেজা নভেম্বরের এক বিকেলে, এডিথ হাসিমুখে বসে আছেন সহকর্মীদের সঙ্গে। পাশেই এক কর্মীর ছেলে ডিয়াগো, যিনি সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত, ধীরে ধীরে র্যাম্প বেয়ে উপরে উঠছেন। তাঁর কব্জিগুলো বাঁকা, হাঁটতে পারেন না—তবুও থেমে নেই।
“ডিয়াগো, আমার ছেলে!” বলে চিৎকার করে উঠে এডিথ। ছুটে গিয়ে তাঁকে কোলে তুলে নেন, গালে চুমু খান, হাসিতে মুখ ভরে ওঠে দুইজনের।
এই দৃশ্য দেখে যে কেউ ভাবতে পারেন—এটি যেন এক বিশাল পরিবারের ঘরোয়া পরিবেশ।
নিজের সন্তানের মধ্য দিয়েই শুরু
এডিথের নিজস্ব অভিজ্ঞতাও কম করুণ নয়। ২০০০ সালে জিনজায় তাঁর প্রথম সন্তান ডেরিক জন্ম নেন। জন্মের দুই দিন পরই জন্ডিস ও অতিরিক্ত কান্নায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। চিকিৎসকরা ভুল করে ম্যালেরিয়া ধরেন। কিন্তু আসলে তিনি মেনিনজাইটিস-এ আক্রান্ত হয়ে মেরুদণ্ডে জটিলতা তৈরি করেন। এতে তার মস্তিষ্কে গুরুতর ক্ষতি হয়।
তিন মাস বয়সে এডিথ বুঝতে পারেন, তাঁর সন্তান স্বাভাবিক নয়। “ওর ঘাড় সোজা হতো না, পিঠ বাঁকা, শরীর নরম, একদম নিস্তেজ।”
তবে সমাজের চোখে ডেরিক ছিল ‘অভিশপ্ত শিশু’। “লোকজন বলত—ডাইনির সন্তান। আমার গায়ে ভয়ে কেউ হাত দিত না।” সেই সময় চিকিৎসা না পেয়ে তিনি বাধ্য হন ছেলের চিকিৎসার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন জাদু-টোনায়। রাতের আঁধারে মুরগির রক্তে গোসল করানো, গায়ে গাছের পেস্ট লাগানো—সবই করেছিলেন। ফল শূন্য। বরং অবস্থা আরও খারাপ হয়।
শেষমেশ এক বৃদ্ধ দম্পতির পরামর্শে আবার হাসপাতালে যান। ততদিনে ১২ মাস পার হয়ে গেছে। ডেরিককে জানানো হয়—তিনি স্থায়ী প্রতিবন্ধী। কথা বলতে বা হাঁটতে পারবেন না, নিজের খাওয়াও পারবেন না।
‘ভবিষ্যতের জন্য স্বপ্ন’
এডিথ আজও আশা ছাড়েননি। তাঁর বিশ্বাস—শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ও সচেতনতার মাধ্যমে সমাজ একদিন বদলাবে। যেভাবে একদা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল, আজ সেই সমাজই তাঁর প্রতিষ্ঠানে ভালোবাসা খুঁজে পায়।
“আমি চাই, সবাই বুঝুক—প্রতিবন্ধিতা কোনো লজ্জা নয়, এটি এক ধরনের সক্ষমতা। এদের হাসিই তো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস।”
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ