যে ইরানে মেয়েরা চুল কেটে রাস্তায় নামে, সেই ইরানেই লাখো নারী ধর্মনিষ্ঠার ব্যানার ধরে

সংগৃহীত ছবি
ইরান কখনো একমুখী দেশ ছিল না। এই ভূমি একইসঙ্গে বহন করে ইসলামী শাসনের কঠোরতা, প্রগতিশীল আন্দোলনের দাবানল, জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্য আর ইতিহাসের বহুস্তর বিশ্লেষণ।
যে ইরানে হিজাববিরোধী আন্দোলনে মেয়েরা চুল কেটে রাস্তায় নামে, সেই ইরানেই লাখো নারী কালো চাদর পরে একুশ শতকেও ধর্মনিষ্ঠার ব্যানার ধরে। একদিকে মাশা আমিনির স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন, অন্যদিকে খোমেনীর জামারানে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি বাজে।
এক দেশে দুই ইরান-এটাই ছিল পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আসে, যা সমস্ত দ্বন্দ্বকে অস্থায়ী বিরতিতে পাঠিয়ে দেয়। যা প্রমাণ করে সব তর্কের ওপরে, সব মতপার্থক্যের ওপরে একটা ভূখণ্ড, একটা পতাকা, একটা অস্তিত্ব দাঁড়িয়ে থাকে।
এমনই এক মুহূর্ত নিয়ে এসেছে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ।
ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বা বৈরিতা তো নতুন নয়। নতুন হলো-যুদ্ধে ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের বিস্ময়কর উত্থান।
যে বেলুচ জাতিগোষ্ঠী বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়ছে, যে কুর্দিরা স্বাধীনতা চায়, যে আজারি জনগণ নিজস্ব পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে! সেইসব জনগোষ্ঠীই আজ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে বলছে-“ইসরায়েলকে জবাব দিতে হবে।” কয়েকজন নেতা হুমড়িতমরি করলেও জনগণের দৃঢ় চাপে তাদের থেমে যেতে হয়েছে।
বিদেশে নির্বাসনে থাকা শাহি পরিবারের উত্তরসূরি রেজা পাহলভি যখন আহ্বান জানিয়েছেন, “এই যুদ্ধের সুযোগে বিদ্রোহ করো”-তখন ইরানিরা পাল্টা বলেছে, “এটা বিদ্রোহের সময় নয়, সংহতির সময়।”
তেহরানের রাজপথ, ইসফাহানের মসজিদ, মাসজানদের ভাঙা শহর-সর্বত্র শুক্রবারের নামাজের পর বের হয়েছে বিশাল বিশাল বিক্ষোভ। কোনো দলীয় পতাকা নয়, ছিল শুধু দেশের পতাকা। কোনো নেতা-মোল্লা বা রাজপুত্র নয়, ছিল শুধু জনগণ।
এই ঐক্য স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে-ইরান কেবল শাসক শ্রেণির ইরান নয়, এটি জনগণের ইরান। এখানে ইসলামপন্থী আছে, প্রগতিশীলও আছে; আছে যারা বোরকা পরে, আবার যারা কাঁধে গানবাজনার গিটার ঝুলিয়ে হাঁটে।
এই ঐক্য নতুন কিছু নয়, ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়েও ঠিক এমনটাই হয়েছিল। ১৯৮০ থেকে ৮৮ সাল-এই আট বছর শিয়া রাষ্ট্র ইরানকে ঠেকাতে সুন্নি আরব দেশগুলো একজোট হয়েছিল। পশ্চিমারা তখন ভেবেছিল, ইরান দ্রুত ভেঙে পড়বে।
কিন্তু হয়নি। এইবারও ইতিহাস ফিরে এসেছে।
রাষ্ট্র মানে কেবল সরকার নয়। রাষ্ট্র মানে ভূখণ্ড, ইতিহাস,পূর্বপুরুষ, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
অনেকেই বলেন, "ইরানে গণতন্ত্র নেই।" হয়তো তা-ই। কিন্তু গণতন্ত্র না থাকলেও-দেশপ্রেম আছে।
চলমান সংকট প্রমাণ করেছে, দেশে হাজারো সমস্যা থাকলেও মানুষের ভেতরে জাতিগত অর্গানিক ঐক্য এখনো জাগ্রত। এই বোধই জাতিকে বাঁচিয়ে রাখে, যুদ্ধ জেতায়, ভবিষ্যতের গল্প লিখে দেয়।
ইরানের অভ্যন্তরে আজ বহু সুর, বহু ভাষা, বহু চেতনার মিলন ঘটেছে এক কণ্ঠে। এই মিলন অস্থায়ী কিনা, তা সময় বলবে। কিন্তু এই মুহূর্তে এটিই সত্য, একটি যুদ্ধ এসে সব বিভাজনের রেখা মুছে দিয়েছে। আমরা যে ইরানকে চিনতাম-বিদ্রোহী, ভাঙাচোরা, দ্বিধাগ্রস্ত-আজ সে ইরানকে দেখছি দৃঢ়, ঐক্যবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী।
ইতিহাস হয়তো এটাকেই বলবে—যুদ্ধকালীন সংহতির বিস্ময়।
লেখক: সাংবাদিক।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেআইকে