
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি জানিয়েছেন, তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম কখনোই বন্ধ করবে না। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনি এ ঘোষণা দেন।
বুধবার (৪ জুন) একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রস্তাব আমাদের জাতির আত্মনির্ভরতার আদর্শ এবং "আমরাও পারি" এই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
এই বক্তব্য দিয়েছেন এমন সময়, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সম্ভাব্য নতুন পারমাণবিক চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আলোচনার সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান সম্পূর্ণভাবে সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করুক কিংবা খুবই নিন্মমাত্রায় সীমিত রাখুক। এর বিনিময়ে তেহরানের ওপর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে খামেনি বলেছেন, ‘ইরানের জ্বালানি স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ একটি মৌলিক বিষয়। স্বাধীনতার অর্থ, আমেরিকা বা আমেরিকার মতো দেশগুলোর অনুমতির জন্য অপেক্ষা না করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব ১০০ শতাংশ ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের বিরুদ্ধে।’
খামেনি হুঁশিয়ার করে বলেন, "আমরা যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকব না।"
তিনি সমালোচনা করে বলেন, ‘কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাথানত করাকে বাস্তবতা বা যুক্তিবাদ ভাবেন। এটা কোনো যুক্তিবাদ নয়। আপনি কেন ঠিক করবেন—ইরান সমৃদ্ধ করবে কি না!’
এদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও মঙ্গলবার বলেছেন, তেহরান তার বৈজ্ঞানিক ও পারমাণবিক অধিকার পরিত্যাগ করবে না, তবে পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ চায় না।
তিনি বলেন, ‘যারা ইরানকে অভিযুক্ত করছে, তারাই গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করছে এবং এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করছে।’
এর আগে সোমবার, বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে যাচ্ছে। এক কূটনীতিকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, প্রস্তাবটি একেবারেই "গ্রহণযোগ্য নয়", কারণ এতে ওয়াশিংটনের অবস্থানে কোনো নমনীয়তা নেই এবং ইরানের স্বার্থের প্রতিফলন ঘটেনি।
ইরান বহুদিন ধরেই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে এবং তারা পরমাণু অস্ত্র তৈরির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ, যিনি আলোচনায় মার্কিন দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, বলেন—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান, ইরান কোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণই না করুক। এটি মার্কিন পক্ষের "রেড লাইন"।
জাতিসংঘের ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরান গত তিন মাসে প্রায় ৫০ শতাংশ হারে অস্ত্রমানের কাছাকাছি ইউরেনিয়াম উৎপাদন বাড়িয়েছে। যদিও এখনো ৯০ শতাংশ শুদ্ধতার কাছাকাছি পৌঁছায়নি, যা পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সাধারণত ৪ শতাংশ শুদ্ধতাই যথেষ্ট।
এদিকে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) ওই প্রতিবেদনের কড়া সমালোচনা করে তেহরান বলেছে, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভিত্তিহীন অভিযোগের পুনরাবৃত্তি।
বর্তমানে ইরান একাধিক সংকটে জর্জরিত। দেশটির মুদ্রার মান পড়ে যাচ্ছে, আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত, এবং পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলার শঙ্কা বাড়ছে।
নতুন পারমাণবিক চুক্তি ব্যর্থ হলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—বিশেষ করে ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। তথ্যসূত্র আল জাজিরা
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ