
ইসরায়েলের অব্যাহত হামলায় গাজায় ধ্বংস হচ্ছে শুধু ঘরবাড়ি নয়, ভেঙে পড়ছে মানবিক বেঁচে থাকার ভিত্তিও—খাদ্য। খাবার কেনা, বিক্রি বা সরবরাহ করা এখন জীবন হাতে নিয়ে খেলা করার মতো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
গত ২৭ এপ্রিল দেইর আল-বালাহতে সবজির দোকানে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন সামের—একজন আইনজীবী, যিনি যুদ্ধের কারণে বাধ্য হয়ে সবজি বিক্রি শুরু করেছিলেন। তিনি ছিলেন নিরস্ত্র, রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তাঁর একটাই উদ্দেশ্য ছিল সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া।
সামের ভগ্নিপতি এবং গাজায় বসবাসকারী লেখক ও শিক্ষিকা সুমাইয়া মোহাম্মদ জানান, সামের প্রায়ই বিনামূল্যে পরিবারের জন্য সবজি দিতে চাইতেন, কিন্তু আত্মসম্মানের কারণে তাঁরা তা নিতেন না। সামের মারা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী তিন সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামে নেমেছেন। সন্তানরা প্রতিদিন জিজ্ঞেস করে—“বাবা কখন ফিরবে বাজার থেকে?” অথচ সেই বাবা আর কখনও ফিরবেন না।
সামের মৃত্যুর ১০ দিন পর গাজা সিটির রেমাল এলাকার ব্যস্ততম সড়ক আল-ওয়াহদায় এক রেস্তোরাঁ ও বাজারে হামলায় প্রাণ হারায় অন্তত ৩৩ জন। এর আগে জাবালিয়ার একটি বেকারির পাশে, খান ইউনুসের খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে এবং বিভিন্ন বাজারে একের পর এক হামলা হয়েছে।
গাজা সরকারের গণমাধ্যম অফিস জানায়, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৩৯টি খাদ্য বিতরণ কেন্দ্র এবং ২৯টি কমিউনিটি কিচেন ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকান, বাজার, কৃষিখামার, খাদ্যগুদাম—সব জায়গাতেই হামলা হচ্ছে যেন তারা খাদ্য নয়, অস্ত্র বিক্রি করছিল।
খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল যেন গাজার জনগণের ক্ষুধাকে অস্ত্র বানিয়ে শাস্তি দিচ্ছে। শুধুমাত্র খাদ্য প্রবেশ রোধ নয়, বরং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থাকেও পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করছে।
বর্তমানে যারা সামান্য অর্থে কিছু খাবার কিনতে পারেন, তাদের কাছেও বাজারে রয়েছে কেবল খাবারের টুকরো টুকরো অবশিষ্টাংশ। যাদের হাতে কিছুই নেই, তাদের দিন কাটছে না খেয়ে।
সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু ও নবজাতকরা। ২১ মে ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ক্ষুধা ও চিকিৎসার অভাবে মারা গেছে অন্তত ২৬ জন ফিলিস্তিনি, যাদের মধ্যে ৯ জনই শিশু। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, aid blockade শুরুর পর থেকে অপুষ্টিজনিত কারণে মারা গেছে কমপক্ষে ৫৭ শিশু।
লেখক সুমাইয়া জানান, তিনি দিনের পর দিন না খেয়ে থাকেন যাতে সন্তানদের জন্য অল্প কিছু খাবার রাখা যায়। তাঁর স্বামী সারাদিন খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ান, আর ফিরে আসেন পুরনো রুটি বা এক টুকরো টমেটো নিয়ে। গাজায় বর্তমানে এক বস্তা ময়দার দাম ৪৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল দাবি করছে তারা সাহায্য প্রবেশে বাধা দিচ্ছে কারণ ‘হামাস তা লুট করে’। পশ্চিমা গণমাধ্যম এই দাবি প্রচারে সহযোগিতা করছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ইসরায়েল কেবল হামাস নয়—গাজার পুরো জনগণকে শাস্তি দিচ্ছে ক্ষুধার মাধ্যমে।
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, “গাজার যুদ্ধ বন্ধ হবে তখনই, যখন ফিলিস্তিনিরা গাজা ছেড়ে যাবে”—যা স্পষ্টতই গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উৎখাতের ঘোষণা।
ইসরায়েল বলছে, সোমবার থেকে তারা ৩৮৮টি ত্রাণবাহী ট্রাক ঢুকতে দিয়েছে। অথচ সাহায্য সংস্থাগুলোর দাবি, এ সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে ১১৯। এর মধ্যেও বেশ কিছু ট্রাক হামলার কারণে পৌঁছাতেই পারেনি, আবার কিছু লুট হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনে কমপক্ষে ৫০০টি ত্রাণ ট্রাক প্রবেশ না করলে গাজায় দুর্ভিক্ষ রোধ করা সম্ভব নয়। অথচ বিশ্বের তথাকথিত “মানবিক রাষ্ট্রগুলো” এখনো কেবল হুঁশিয়ারি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে।
সুমাইয়া মোহাম্মদের প্রশ্ন—“আমাদের শিশুরা না খেয়ে মরছে দেখে তবেই কি বিশ্ব বিবেক জাগবে? কেউ কি এখনো আমাদের জন্য ভাবেন? কবে থামবে এই নিষ্ঠুর ক্ষুধার যুদ্ধ?”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: নিন্দা, উদ্বেগ ও সীমিত পদক্ষেপ
গাজায় চলমান মানবিক সংকটের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করলেও বাস্তব পদক্ষেপ ছিল সীমিত এবং বিলম্বিত।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে বলেন,
"গাজায় ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন। যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে অবশ্যই বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং মানবিক সহায়তা প্রবাহে বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।"
ইউনিসেফ জানিয়েছে,
“গাজায় শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার এখন মহামারির রূপ নিয়েছে। আমরা প্রতিদিন ক্ষুধার কারণে শিশু মৃত্যুর খবর পাচ্ছি। এ এক নীরব গণহত্যা।”
ইউরোপীয় ইউনিয়ন গাজার পরিস্থিতিকে "মানবিক বিপর্যয়" বলে আখ্যা দিয়েছে এবং ত্রাণ প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করায় ইসরায়েলের সমালোচনা করেছে। তবে তীব্র নিন্দা ছাড়া ইসরায়েলের ওপর কোনো কার্যকর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি।
আইসিসি'র (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত) প্রসিকিউটর কারিম খান সম্প্রতি বলেন,
"যুদ্ধের কৌশল হিসেবে যদি খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে ক্ষুধা প্রয়োগ করা হয়, তবে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।"
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলের অবস্থানকে সমর্থন করলেও বর্তমানে সামান্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। হোয়াইট হাউজ থেকে জানানো হয়েছে,
“আমরা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি যেন ত্রাণ কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালিত হয়। গাজার শিশুদের মৃত্যুর ছবি আমাদের বিবেক নাড়া দিয়েছে।”
তবে সমালোচকরা বলছেন, এই ধরনের বিবৃতি শুধু মানবিকতার মুখোশ, বাস্তব নীতিতে এর কোনো প্রতিফলন নেই।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ও Doctors Without Borders (MSF) বারবার গাজার খাদ্য সংকট নিয়ে সতর্ক করে আসছে। তারা ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
আজ গাজার মানুষের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—একটুখানি রুটি, যা তাদের সন্তানদের ক্ষুধা কিছুক্ষণের জন্য হলেও থামিয়ে রাখতে পারবে।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—কে এই মানুষগুলোর কান্না শুনবে? কবে থামবে এই নিষ্ঠুরতা?
সুমাইয়া মোহাম্মদ গাজায় বসবাসরত একজন লেখিকা ও শিক্ষিকা। তিনি The Electronic Intifada, The Washington Report on the Middle East Affairs এবং We Are Not Numbers-এর মতো আন্তর্জাতিক মাধ্যমে নিয়মিত লিখছেন।
অনুবাদ: কামাল হোসাইন