
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সিনিয়র ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। মানসিক চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং ক্যারিয়ার নিয়ে গভীর হতাশা তাদের গ্রাস করে ফেলেছে।
গত শনিবার (১৭ মে) রাতে এক খোলা চিঠিতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা আমাদের পিতৃতুল্য, আমাদের প্রেরণা, আপনাদের ছায়ায়ই আমরা বেড়ে উঠেছি।’ কিন্তু সেই শিক্ষকগণের স্নেহবঞ্চিত হয়ে তারা এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে।
তারা আরও উল্লেখ করেন, ১৮ ফেব্রুয়ারি কুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও বিএনপির সন্ত্রাসী হামলায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী এবং একজন সম্মানিত শিক্ষক গুরুতর আহত হন। শিক্ষার্থীদের দাবি, এ ঘটনা কুয়েটের ইতিহাসে এক মর্মান্তিক ও কলঙ্কজনক অধ্যায়। এ হামলার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য বিচার নিশ্চিত করতে তারা বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির আহ্বান জানিয়েছেন।
তারা বলেন, ‘আমরা চাই, এই তদন্ত কোনো অভ্যন্তরীণ প্রভাবমুক্ত পরিবেশে, অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হোক। এর মাধ্যমে প্রকৃত দোষী শনাক্ত হয়ে শাস্তি পাক এবং নিরপরাধরা মুক্তি পাক।’
শিক্ষার্থীরা এটাও স্পষ্ট করেছেন যে দোষী প্রমাণিত হলে কাউকে রক্ষার চেষ্টা করা হবে না। একই সঙ্গে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন—কিছু সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক পেজ থেকে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য এবং প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, যেগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
শিক্ষার্থীরা বিশ্বাস করেন, আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান সম্ভব। তাই তারা সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দকে একসঙ্গে বসে খোলামেলা সংলাপে অংশ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
বিবৃতির শেষ অংশে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা আবারও বিনীতভাবে ক্ষমা চাইছি। যদি আমাদের কোনো কথায়, আচরণে আপনাদের মনে কষ্ট দিয়ে থাকি, আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কুয়েট শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল-যুবদলের নেতা-কর্মীদের হামলায় ১৫০-এরও বেশি শিক্ষার্থী হতাহত হন। এরপর থেকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগসহ ৬ দফা দাবি জানায়। টানা ৩ মাস আন্দোলনের প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উপাচার্যকে অপসারণ করে।
শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, ছাত্র-শিক্ষক লাঞ্ছনার বিচারের আগে তারা কোনো প্রকার একাডেমিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবেন না। এর জন্য তারা ৭ দিনের আল্টিমেটামও দেন। তদন্ত কমিটির রায় অনুযায়ী ৩৭ শিক্ষার্থীকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া, উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান, শিক্ষক লাঞ্ছনা, জোরপূর্বক হলে প্রবেশ, রাহুল জাভেদ নামে এক শিক্ষার্থীকে ইট মারাসহ ৭টি বিষয়ে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি, এখানে নিরাপরাধ শিক্ষার্থীদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। তারা তদন্ত কমিটির এই রায় অস্বীকার করে ডিসির কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনসহ ৩ দফা দাবি জানায়। তারা বলেন, নাম প্রকাশ না করে যাদের শোকজ দেওয়া হয়েছে, সেটি কেউ না জানলেও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা তা জেনে যায়- যা তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ফলস্বরূপ, গত ১৫ তারিখে শিক্ষার্থীদের শাস্তির বিষয়ে সিন্ডিকেট মিটিং অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা বাতিল করতে বাধ্য হয় প্রশাসন।
এর আগে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছে কয়েক দফায় ক্ষমা চেয়ে ক্লাস ফেরানোর অনুরোধ জানালেও শিক্ষকরা তাদের দাবিতে অনড় ছিলেন। কখনো খোলা চিঠিতে, কখনো ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাইলেও শিক্ষকরা ক্লাসে ফিরতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
ক্লাস শুরুর অনিশ্চয়তা এবং পক্ষপাতদুষ্ট, প্রহসনমূলক বিচারের ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। এজন্যই তারা গতকাল রাতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান, যাতে করে শিক্ষার্থী হামলা ও শিক্ষক লাঞ্ছনার বিচার নিরপেক্ষভাবে হতে পারে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম