
শহরের কোন এক জনপ্রিয় ক্যাফেতে বসে আছে কয়েকজন তরুণ-তরুণী। টেবিলে রাখা আইসক্রিম গলে পড়ছে, অথচ কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। সবার নজর নিজ নিজ মোবাইলের স্ক্রিনে- কেউ মিম শেয়ার করছে, কেউ স্ন্যাপচ্যাটে রিপ্লাই দিচ্ছে, কেউ বা ইনস্টাগ্রামে ছবি ‘লাইক’ করছে। পাশে বসা মানুষগুলো যেন তাদের অপরিচিত কেউ।
এমন দৃশ্য এখন খুবই সাধারণ। ক্যাম্পাস, রেস্টুরেন্ট, বাসা বা চায়ের আড্ডায় একই চিত্র দেখা যায়। সবাই যেন এক অদৃশ্য দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে পড়েছে- যেখানে ভার্চুয়াল মিডিয়ায় তৈরি হচ্ছে সম্পর্ক, আর বাস্তব সংযোগ হয়ে পড়ছে দুর্বল।
সোশ্যাল মিডিয়া যাত্রা শুরু করেছিল মানুষের যোগাযোগ ব্যাবস্থা কে সহজ করার জন্য। কিন্তু আজ এটি বাস্তব জীবনের যোগাযোগ ও সম্পর্ককে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। চ্যাটিং, ভয়েস নোট, ইমোজির মাধ্যমে কথোপকথন সহজ হলেও, তা আমাদের ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে একে অন্যের কাছ থেকে।
বর্তমান প্রজন্মের কিছু তরুণদের কাছে প্রশ্ন করে জানা যায়, অনলাইনে তারা খুব আত্মবিশ্বাসী হলেও বাস্তবে একদম উল্টো। ফলে তারা ক্রমেই হারিয়ে ফেলছে চোখে চোখ রেখে কথা বলার স্বাভাবিকতা বা মনের কথা মুখে বলার সাহস।
এই আত্মবিশ্বাসের ভিন্নতা তৈরি হয়েছে একটি ‘সেফ জোন’- এর কারণে। ভার্চুয়াল জগতে আমরা নিজের ইচ্ছামতো নিজেকে উপস্থাপন করতে পারি। মুখে মুখে কথা বলার জায়গায় এখন টাইপ করে ইমোশন প্রকাশ করি, ভুল করলে তা ‘ডিলিট’ করে দিতে পারি, মুখ লুকিয়ে ফেলি এক ক্লিকেই। কিন্তু বাস্তব জীবনে তো এভাবে পালানো যায় না- তাই ধীরে ধীরে আমরা বাস্তব জীবনের যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে শুরু করেছি।
তরুণদের অনেকেই এখন সামনাসামনি কথা বলায় অস্বস্তি অনুভব করে। অপরিচিত কারও সঙ্গে আলাপ শুরু করার কথা তো তারা ভাবতেও পারেনা। এই পরিবর্তন শুধু মানসিক নয়, শারীরিকভাবেও প্রচুর প্রভাব ফেলে- হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, হাত পা ঘামা, চোখে চোখ রাখতে ভয় হওয়া তার মধ্যে অন্যতম।
২০২৩ সালে এক আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ জেন জেড (Gen Z) তরুণ-তরুণী “স্থায়ী একাকীত্ব” অনুভব করে, যদিও তারা দিনে গড়ে ৭–৮ ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকে। হাজার হাজার ‘লাইক’ বা ‘ফলোয়ার’ থাকলেও, ঘুমাতে যাওয়ার সময় তারা মনে করে- তাদের জীবনে এমন কোন সঙ্গী নেই যার সাথে সত্যিকার কথা বলা যায়।
এই একাকীত্ব দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে, আবেগ প্রকাশের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে, এমনকি নতুন বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক গড়তেও সমস্যা হচ্ছে। পেশাগত ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে- ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে, টিমওয়ার্ক করতে পারছে না, অফিসিয়াল মিটিংয়ে আত্মপ্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছে অনেক তরুণ।
তবে সবকিছুই অন্ধকার নয়। অনেক তরুণ এখন এই সমস্যা নিজেরাই বুঝতে পারছে। কেউ মোবাইল ব্যবহার কমাচ্ছে, কেউ অফলাইন সময় কাটাচ্ছে প্রকৃতির মাঝে, কেউ বন্ধুদের সাথে কিছু সময় ফোনবিহীন আড্ডা দিচ্ছে। “ডিজিটাল ডিটক্স,” “অফলাইন উইকেন্ড,” বা “নো স্ক্রিন সানডে”-র মতো ট্রেন্ডও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ধীরে ধীরে।
প্রযুক্তি আমাদের শত্রু নয়। কিন্তু সেটিকে জীবনের একমাত্র মাধ্যম বানিয়ে ফেলা আমাদের ভুল। হাসি ফিল্টার ছাড়া যেমন সবচেয়ে প্রাণবন্ত, তেমনি সম্পর্কও সবচেয়ে সুন্দর হয় স্পর্শে, অনুভবে, বাস্তব আলাপে। আমাদের আবারও শেখা দরকার—কীভাবে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হয়, মন খুলে হাসতে হয়, চুপচাপ পাশে বসে থেকেও একজনের অস্তিত্ব অনুভব করতে হয়।
হয়তো এখনই সময়- স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে পাশে থাকা মানুষটিকে সত্যিকার অর্থে দেখার।
স্বদেশ প্রতিদিন