প্রকাশ: শনিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৫, ৭:৫৩ পিএম

‘এ-কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে
এই তো নদীর খেলা।
সকাল বেলা আমির রে ভাই,
ফকির, সন্ধ্যাবেলা’
কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতার পংক্তিগুলো বাংলাদেশের নদীভাঙনের বাস্তবতাকে জীবন্ত করে তোলে। প্রতি বছর নদীভাঙনের শিকার হাজারো মানুষ তাদের জমি ও বসতভিটা হারাচ্ছেন, যা জমির মালিকানা নিয়ে জটিল আইনি বিরোধ সৃষ্টি করছে।
নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে জমির ধীরে ধীরে ক্ষয় বা নতুন জমি সৃষ্টি হওয়াকে যথাক্রমে ডিলুভিয়ন ও অ্যালুভিয়ন বলা হয়। ১৮২৫ সালের 'বেঙ্গল অ্যালুভিয়ন অ্যান্ড ডিলুভিয়ন রেগুলেশন' এবং পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের 'স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্ট' অনুযায়ী, নদীভাঙনে হারানো জমি যদি ৩০ বছরের মধ্যে পুনর্গঠিত হয়, তবে মূল মালিক বা তার উত্তরাধিকারী তা ফেরত পেতে পারেন। অন্যদিকে নতুন সৃষ্ট চর জমি সরকারের মালিকানায় যায়। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ প্রায়ই অকার্যকর।
চর জমির উর্বরতা এটিকে লোভনীয় লক্ষ্যে পরিণত করেছে। গবেষণায় দেখা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদরা সরকারি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে অবৈধভাবে এসব জমি দখল করে নেন। লাঠিয়াল বাহিনীর মাধ্যমে তারা জমি রক্ষা করেন, এমনকি সহিংসতাও ঘটান। প্রকৃত ভূমিহীনরা আইনগত অধিকার থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ ১.৩ কোটি জলবায়ু অভিবাসী সৃষ্টি হতে পারে। নদীভাঙনের শিকার মানুষরা শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন, যেখানে তাদের জীবনযুদ্ধে নামতে হয় রিকশাচালক বা দিনমজুর হিসেবে। সরকার ও এনজিওগুলোর সহায়তা এই সংকট মোকাবেলায় অপর্যাপ্ত।
নদীভাঙন রোধে ড্যাম ও ব্যারাজ নির্মাণ জোরদার করা এবং ভূমিহীনদের জন্য চর জমি বরাদ্দের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য স্থায়ী আশ্রয় ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করা, অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা নেওয়া এবং প্রকৃত দাবিদারদের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নদীভাঙন ও জমির অধিকার বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল ও ক্রমবর্ধমান সমস্যা। আইনগত সংস্কার, সামাজিক সচেতনতা ও সরকারি পদক্ষেপের সমন্বয়ে এই সংকট মোকাবেলা সম্ভব। নদীর খেলায় যেন মানুষের জীবনের খেলা না হারায়, সেদিকে সবার নজর দেওয়া প্রয়োজন।
লেখক: আইনের শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস।
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর