
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে চীনা সেনাদের সঙ্গে একাধিক অমীমাংসিত মুখোমুখি অবস্থান চলছে বলে জানিয়েছেন দেশটির চীন সীমান্তরক্ষী আধাসামরিক বাহিনী ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুর।
২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ছয় বছর পর নতুন করে সীমান্ত উত্তেজনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক ভাবমূর্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে কাপুরের এ বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন কয়েক মাস ধরে অরুণাচল প্রদেশের প্রত্যন্ত এলাকায় চীনা সেনাদের অনুপ্রবেশ এবং ভারতীয় সেনাদের টহল দিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
গত মাসে সাত বছর পর প্রথমবারের মতো ভারত সফরে যান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে তিনি মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাবে বেইজিং ও নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। তবে ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ
আইটিবিপির প্রধান কাপুর জানিয়েছেন, অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি অঞ্চলে চীনা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান এখনো অব্যাহত রয়েছে। সেখানে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কমান্ডোরা সক্রিয় রয়েছেন।
ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের শিকড় ব্রিটিশ আমলে নির্ধারিত ম্যাকমোহন রেখায়। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বতের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিমলা কনভেনশনে এ সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারত এ রেখাকে চীনের সঙ্গে নিজেদের সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠার পর চীন ওই সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে। বেইজিং অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে এবং ‘দক্ষিণ তিব্বত’ নামে অভিহিত করে। অন্যদিকে, বিতর্কিত কাশ্মীরের আকসাই চিন অঞ্চল চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
১৯৬২ সালে দুই দেশ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখাকে (এলএসি) কার্যত সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করে বিরোধ নিষ্পত্তির আলোচনা চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়। কিন্তু সীমান্তের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।
২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হন। পরে চীনও তাদের চার সেনার মৃত্যুর কথা স্বীকার করে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থির মতে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির উদ্যোগের মধ্যেও সীমান্তে উত্তেজনা অব্যাহত থাকা একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ। তাঁর ধারণা, বেইজিং চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এমন অবস্থান নিচ্ছে। সীমান্ত চিহ্নিত না থাকায় মাঝেমধ্যে এ ধরনের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হওয়া অনিবার্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মোদির বক্তব্য নিয়ে পুরোনো প্রশ্ন
২০২০ সালের সংঘাতের পর চীনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন মোদি। ওই সময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার ভারতীয় অংশে স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করেছিল চীন। মন্ত্রণালয়ের দাবি ছিল, পরিকল্পিতভাবে চীনা পক্ষের নেওয়া পদক্ষেপই সংঘর্ষ ও প্রাণহানির জন্য দায়ী।
কিন্তু দুই দিন পর মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ভারতের ভূখণ্ডে কেউ প্রবেশ করেনি এবং কেউ সেখানে অবস্থানও করছে না। সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এ মন্তব্যের অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিরোধীরা। পরে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানায়, সংঘর্ষের পর ভারতীয় ভূখণ্ডে কোনো চীনা সেনা অবস্থান করছিল না—মোদি সেটিই বোঝাতে চেয়েছিলেন।
ছয় বছর পর অরুণাচল প্রদেশে নতুন করে অনুপ্রবেশের অভিযোগ মোদির নিরাপত্তাবিষয়ক কঠোর অবস্থানের ভাবমূর্তিকে আবারও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
অরুণাচল প্রদেশের কংগ্রেস নেতা বসিরাম সিরামের দাবি, চীনা সেনারা আপার সুবানসিরি এলাকায় ভারতের প্রায় ৫০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে অবস্থান নিয়েছে। গত আগস্টে সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনের পর তিনি বলেন, চীনা সেনাদের পাহাড়ের চূড়ায় দেখা যাচ্ছে, আর ভারতীয় সেনারা রয়েছেন নিচে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, চীনা বাহিনী প্রতিষ্ঠিত টহলব্যবস্থা থেকে সরে এলে সীমান্ত পরিস্থিতি মাঝেমধ্যে বিঘ্নিত হয়। তবে চলমান মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
স্থায়ী সমাধান এখনও অধরা
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনবিষয়ক অধ্যাপক বি আর দীপকের মতে, অনুপ্রবেশের অভিযোগ মোদির বিশ্বাসযোগ্যতা ও জবাবদিহির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
২০১২ সাল থেকে সীমান্ত বিরোধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দুই দেশ একটি যৌথ পরামর্শ ও সমন্বয়ব্যবস্থা চালু রেখেছে। গত ৬ আগস্ট এ ব্যবস্থার ৩৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেপ্টেম্বরে অরুণাচল প্রদেশে প্রথমবারের মতো কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকও হয়েছে।
তবে দীপকের মতে, এসব আলোচনা সীমান্তে সাময়িক উত্তেজনা কমাতে পারলেও কয়েক দশকের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিরোধের স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও সমন্বিত পদক্ষেপ না থাকলে সীমান্তে যেকোনো সমঝোতাই ভঙ্গুর থেকে যাবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ