| শিরোনাম: |

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বারবার বাধার মুখে পড়ছে। ট্রাম্পের লক্ষ্য যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করা। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে অর্থনৈতিক সুবিধার চেয়ে সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে মস্কো নিজেদের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন।
ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত চুক্তি ও বাণিজ্যকেন্দ্রিক। তাঁর ধারণা, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করা গেলে রাশিয়ার ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা সম্ভব হবে এবং দুই দেশের মধ্যে বড় পরিসরে বাণিজ্যিক লেনদেন শুরু হতে পারে। এতে যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয় কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুবিধাও অর্জিত হবে। কিন্তু পুতিনের অবস্থান থেকে স্পষ্ট, এসব সম্ভাবনা তাঁকে যুদ্ধের লক্ষ্য থেকে সরে আসতে উদ্বুদ্ধ করছে না।
সম্প্রতি সেন্ট পিটার্সবার্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফের সঙ্গে পুতিনের তিন ঘণ্টার বৈঠকে দুই পক্ষের অবস্থানের এই পার্থক্য আবারও সামনে আসে। বৈঠকে পুতিন নরওয়েতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ন্যাটোর কর্মকর্তা ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত আলোচনা সম্পর্কে জানতে চান। উইটকফ মার্কিন প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তবে বৈঠকের পর ক্রেমলিনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, মার্কিন প্রস্তাবে ইউক্রেন সংকট সমাধানের মতো কার্যকর উপাদান নেই।
ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনবাসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর প্রভাব বজায় রাখা রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে। এসব বিষয়ে মস্কো এখনো কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন আশা করেছিল অর্থনৈতিক ছাড় ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে রাশিয়াকে সমঝোতায় আনা সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পদক্ষেপও আলোচনায় এসেছে। ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা ছিল, এ ধরনের ছাড়ের বিনিময়ে মস্কো ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় নমনীয় হবে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এ পদক্ষেপ রাশিয়ার অর্থনৈতিক সুবিধা বাড়ালেও যুদ্ধ নিয়ে দেশটির অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারেনি।
এ ছাড়া ট্রাম্প ইউক্রেনের সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইউক্রেনের হামলা বন্ধে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে এসব উদ্যোগও প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ব্যবসায়িক মনোভাব ও দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহকে মস্কো নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গের বৈঠকে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও কয়েকটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরে। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে সার আমদানি, ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং যৌথ জ্বালানি প্রকল্পের বিষয় রয়েছে। রাশিয়ার ওয়েলথ ফান্ডের প্রধান কিরিল দিমিত্রিভ বৈঠকের পর জানান, দুই পক্ষ ডেটা সেন্টার ও জ্বালানিসংক্রান্ত কয়েকটি সম্ভাব্য প্রকল্প নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আরেকটি পদক্ষেপ হিসেবে বৈঠকের আগে রাশিয়া ৭৪ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেয়। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তাঁকে আটক করা হয়েছিল। ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধি উইটকফ এই মুক্তির ঘটনাকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে পুতিনের প্রশংসা করেন। হোয়াইট হাউস ও ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটিকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
তবে সমালোচকদের মতে, বন্দিমুক্তির মতো পদক্ষেপকে বৃহত্তর কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁদের ধারণা, এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে পুতিন ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে চাইছেন, যদিও ইউক্রেন যুদ্ধের মূল বিরোধগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ এখনো রাশিয়ার অবস্থান বদলাতে পারেনি। বরং মস্কো অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সীমিত মানবিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা সামনে রেখে নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য ধরে রেখেছে। ফলে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুতিনের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনে রাজি করানো।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ