
ফ্রান্সে বিক্ষোভ ও সংঘাতের উত্তেজনার মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন আন্দোলন ও ধর্মঘটের প্রস্তুতি চলছে। ফ্রান্সের আন্দোলনকারীরা আগামী ২৪ অক্টোবর আবারও রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আগামী ২০ নভেম্বর ইউরোপজুড়ে সমন্বিত যুব ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বিভিন্ন বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক সংগঠন।
ফক্স নিউজ ডিজিটালের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভের আয়োজন ও প্রচারে যুক্ত রয়েছে ১০১টি সংগঠনের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। যুক্তরাষ্ট্রসহ নয়টি দেশের সংগঠনগুলো এই নেটওয়ার্কের অংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ৫৪টি সংগঠনের নাম সামনে এসেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সংগঠনের মধ্যে ৩৩টি মূলত শিক্ষার্থী ও তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে এই নেটওয়ার্ককে ‘লাল-সবুজ’ অক্ষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বামপন্থী, কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক সংগঠনের পাশাপাশি ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এসব সংগঠনের মধ্যে সমন্বয়ের প্রকৃতি ও তাদের কার্যক্রমের ব্যাপ্তি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে কতটা উপস্থাপিত হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
২৪ অক্টোবর নতুন বিক্ষোভের ডাক
ফ্রান্সের আন্দোলনকারীরা আগামী ২৪ অক্টোবর ‘অ্যাক্ট টু’ নামে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডিজিটাল মানচিত্রে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ২১২টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।
আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে ৩১ অক্টোবর ‘অ্যাক্ট থ্রি’ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ কর্মসূচিতে হলুদ ভেস্ট পরিহিত বিক্ষোভকারীরা দেশজুড়ে সড়ক ও গোলচত্বর অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া ৫ নভেম্বর ও ১৪ নভেম্বরেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্দোলনের আয়োজকেরা ২০২৭ সালের ৩ এপ্রিল ‘নয়েজি স্প্রিং’ এবং ২৭ মে ‘ডে অ্যাগেইনস্ট অ্যাগ্রোকেমিস্ট্রি’ শিরোনামে কর্মসূচির পরিকল্পনাও করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১০১ সংগঠনের নেটওয়ার্ক নিয়ে অনুসন্ধান
ফক্স নিউজ ডিজিটালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভের প্রচার ও সমন্বয়ে একাধিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে অ্যান্টিফা বা ফ্যাসিবাদবিরোধী পরিচয়ে কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংগঠনও রয়েছে।
প্রতিবেদনে ফ্রান্সের আঙ্কুলেম অঞ্চলে ‘অ্যাকশন অ্যান্টিফা সিক্সটিন’ নামের একটি সংগঠনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন ও কর্মীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্রান্সের বিক্ষোভের ভিডিও প্রচারের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির অধ্যাপক হাতেম বাজিয়ানের নামও প্রতিবেদনে এসেছে। তিনি ‘স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন’ এবং ‘আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইন’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। ফ্রান্সের বিক্ষোভের ভিডিও প্রচারের পাশাপাশি তিনি ১৭ অক্টোবরের ঘটনাগুলোর সঙ্গে ২০২৩ সালের গাজার আল-আহলি হাসপাতাল বিস্ফোরণ এবং ১৯৬১ সালে প্যারিসে আলজেরীয় বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের দমন-পীড়নের ঐতিহাসিক ঘটনার যোগসূত্র তুলে ধরেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বামপন্থী সংবাদমাধ্যম ও প্রচার
ইউরোপের আন্দোলনকে সমর্থন ও প্রচারে ব্রেকথ্রু নিউজ, কোডপিংক এবং পার্টি ফর সোশ্যালিজম অ্যান্ড লিবারেশনসহ কয়েকটি বামপন্থী প্ল্যাটফর্মের ভূমিকার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে সাংহাইভিত্তিক মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা নেভিল রয় সিংহামের নামও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে তাঁকে চীন ও দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ব্রেকথ্রু নিউজের ‘ইউরোপস ইউথ রাইজিং’ শিরোনামের একটি অনলাইন আলোচনায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তরুণদের আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এতে ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, স্পেনের আবাসন সংকটবিরোধী আন্দোলন এবং আলবেনিয়ায় উপকূলীয় প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বিষয় উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব আন্দোলনের পেছনে অর্থনৈতিক কঠোরতা, বাড়িভাড়ার ঊর্ধ্বগতি এবং সামরিক খাতে সরকারি ব্যয়ের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্যারিস, মাদ্রিদ, লিসবন ও তিরানাসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের বিস্তারের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
২০ নভেম্বর আন্তর্জাতিক যুব ধর্মঘট
আগামী ২০ নভেম্বর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক যুব ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়েছে একাধিক বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক সংগঠন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিক্ষোভ, সমাবেশ, ওয়াকআউট ও অবস্থান কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে।
আয়োজকদের ইশতেহারে শ্রমিকদের শোষণ, জলবায়ু সংকট ও যুদ্ধকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সামরিকীকরণ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক কঠোরতা ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতার কথা বলা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন ‘সোশ্যালিস্ট স্টুডেন্টস’ জানিয়েছে, ইউরোপের অন্তত ৩০টি যুব ও শিক্ষার্থী সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা এ ধর্মঘটে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সংগঠনটি তরুণদের সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনের আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘ইয়ুথস্ট্রাইক ডট অর্গ’ নামে একটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন গত ২ আগস্ট নিবন্ধন করা হয়েছে। তবে ডোমেইন নিবন্ধনের তথ্য থেকে এর পেছনে কারা রয়েছেন বা কোন সংগঠন এটি পরিচালনা করছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও ফিলিস্তিন ইস্যু
ফ্রান্সের বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সমস্যার প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব বিক্ষোভে ফিলিস্তিনি পতাকা ও ব্যানার নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে আন্দোলনগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও, সব বিক্ষোভের নেতৃত্ব বা উদ্দেশ্য একই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।
ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও ইউরোপজুড়ে তরুণদের আন্দোলন আগামী দিনগুলোতে কীভাবে এগোয়, তা এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ