
প্রকৃতির এক অনন্য ও জটিল বৈশিষ্ট্য হলো কাইরালিটি। প্রকৃতিতে একই অণুর দুটি রূপ থাকতে পারে, যেগুলো দেখতে অনেকটা একে অপরের দর্পণ-প্রতিবিম্ব বা ‘মিরর ইমেজ’-এর মতো। আমাদের ডান ও বাঁ হাত যেমন দেখতে প্রায় একই হলেও একে অপরের ওপর হুবহু বসানো যায় না, তেমনি কিছু অণুর ক্ষেত্রেও এমন দুটি দর্পণ-প্রতিবিম্ব রূপ বিদ্যমান। রাসায়নিক পরিভাষায় এ দুটি রূপকে বলা হয় এনানশিওমার।
কিন্তু দীর্ঘ চারশত কোটি বছর ধরে বিজ্ঞানীদের মনে একটি বড় প্রশ্ন জাগরূক ছিল—প্রকৃতিতে কেন এসব অণুর দুটি সম্ভাব্য রূপের মধ্যে প্রায় সব সময় কেবল একটি রূপই ব্যবহৃত হয়? অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো জীবনের মৌলিক উপাদানগুলোর এই একক-রূপ ব্যবহারের রহস্য, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘হোমোকাইরালিটি’ বলা হয়, বহু বছর ধরে রসায়নের সবচেয়ে বড় ধাঁধাগুলোর একটি হয়ে ছিল। ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে সেই চারশত কোটি বছরের রহস্যের এক যুগান্তকারী সমাধান এনে দিয়েছেন ফরাসি বিজ্ঞানী হেনরি বি. কাগান এবং জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই।
গবেষণাগারের সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় প্রায়ই দুই ধরনের দর্পণ-প্রতিবিম্ব অণু সমান অনুপাতে, অর্থাৎ প্রায় ৫০:৫০ অনুপাতে তৈরি হয়। অথচ পৃথিবীর সমস্ত জীবিত প্রাণী ও জীবকোষ প্রায় একচেটিয়াভাবে এর একটিমাত্র রূপ ব্যবহার করে আসছে।
৯৫ বছর বয়সী হেনরি বি. কাগান এবং ৭৬ বছর বয়সী কেনসো সোয়াই তাঁদের দীর্ঘ গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, রাসায়নিক বিক্রিয়াকে এমন সূক্ষ্মভাবে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যাতে দুই রূপের একটি অন্যটির তুলনায় বিপুল পরিমাণে বেশি তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত গবেষকদের কাঙ্ক্ষিত রূপটি বেছে নেওয়া সম্ভব হয়। বিশেষ করে কেনসো সোয়াইয়ের আবিষ্কৃত ‘সোয়াই রিঅ্যাকশন’ বা সোয়াই বিক্রিয়া অণুর একটি নির্দিষ্ট কাইরাল রূপ তৈরির ক্ষেত্রে অসাধারণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
এই ঐতিহাসিক আবিষ্কারের নেপথ্যে ছিল বহু দশকের ধারাবাহিক গবেষণা। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ফরাসি বিজ্ঞানী কাগান বিভিন্ন অনুঘটক ব্যবহার করে রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের এক নতুন পথ দেখান, যার মাধ্যমে এক ধরনের দর্পণ-প্রতিবিম্ব অণুর পরিমাণ অন্যটির চেয়ে অনেক বেশি তৈরি করা সম্ভব হয়।
পরবর্তীতে জাপানি বিজ্ঞানী সোয়াই সেই ধারণাকে আরও বহুদূর এগিয়ে নেন। ১৯৯৫ সালে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে তিনি একটি জৈব অণুর কাঙ্ক্ষিত কাইরাল রূপ তৈরির সম্ভাবনা তুলে ধরেন এবং ২০০৩ সালে তিনি এমন এক অনন্য বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সফল হন, যেখানে দুটি সম্ভাব্য রূপের বদলে কেবল একটিই রূপ তৈরি হয়।
নোবেল কমিটির মতে, প্রকৃতির বাইরে ল্যাবে এর আগে আর কেউ এমন অভূতপূর্ব কীর্তি স্থাপন করতে পারেননি। সাধারণ বিক্রিয়ায় অনুঘটক ব্যবহার করে দিক নির্ধারণ করা গেলেও সোয়াই এমন এক পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে বিক্রিয়াটি নিজেই নিজের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট কাইরাল রূপ তৈরিতে ব্যাপক উৎসাহ জোগায়।
মিরর ইমেজ অণুর এই নিয়ন্ত্রণ কেবল তাত্ত্বিক রসায়নের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সরাসরি মানবস্বাস্থ্য ও ওষুধ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। একই রাসায়নিক গঠন থাকা সত্ত্বেও একটি অণুর দুটি ভিন্ন রূপ মানবদেহে পুরোপুরি বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। একটি রূপ হয়তো কাঙ্ক্ষিত আরোগ্য প্রদান করে, আর অন্যটি একেবারেই নিষ্ক্রিয় থাকে অথবা ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৫০-এর দশকের থ্যালিডোমাইড ট্র্যাজেডি এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। গর্ভবতী নারীদের মর্নিং সিকনেসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই ওষুধটির একটি কাইরাল রূপ মারাত্মক জন্মগত ত্রুটির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যার ফলে হাজার হাজার শিশু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মায়।
নোবেল কমিটির সদস্য পিটার সোমফাই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ওষুধের একটি বাঁহাতি সংস্করণ যে প্রভাব ফেলে, ডানহাতি সংস্করণ সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সঠিক কাইরাল রূপটি নির্বাচন করে তৈরি করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি মানবজাতির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
কাইরালিটির এই অনুসন্ধানের শুরু হয়েছিল উনিশ শতকে বিখ্যাত বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের গবেষণার মাধ্যমে। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে টারটারিক অ্যাসিডের দুটি রূপের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া কেবল আঙুরে পাওয়া স্বাভাবিক রূপটিকে গাঁজন করতে পারে, অন্যটিকে নয়। সেদিন থেকেই বিজ্ঞান বিশ্ব জেনেছিল যে সমগঠনের অণুর আচরণ ভিন্ন হতে পারে। তবে কাঙ্ক্ষিত রূপটি কৃত্রিমভাবে তৈরির পদ্ধতি পেতে বিজ্ঞানীদের এক শতকেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
কাগান ও সোয়াইয়ের এই যুগান্তকারী কাজ প্রকৃতি কীভাবে জীবনের জন্য অণুর সঠিক ‘হাতটি’ নির্বাচন করে, গবেষণাগারে তার এক নিখুঁত রাসায়নিক অনুকরণ সৃষ্টি করেছে।
রয়টার্স ও সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক এই যৌথ জয়ের খবর পাওয়ার মুহূর্তে বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই সাধারণ কেনাকাটায় ব্যস্ত ছিলেন। মর্যাদাপূর্ণ এই নোবেলজয়ের মাধ্যমে দুই বিজ্ঞানী ট্রফি ও সনদের পাশাপাশি মোট ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার) ভাগ করে নেবেন, যা আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে সুইডেনের রাজা কার্ল ষোড়শ গুস্তাফের হাত থেকে তারা গ্রহণ করবেন।
এই আবিষ্কার জীবনের উৎপত্তির নতুন গবেষণার দুয়ার উন্মোচন করেছে। কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবী সৃষ্টির শুরুতে কীভাবে প্রথম একটি নির্দিষ্ট অণুর রূপ বেছে নেওয়া হয়েছিল, বিজ্ঞানীরা আজ ল্যাবরেটরিতে তার সফল পুনর্নির্মাণ করতে পেরেছেন।
সোয়াই রিঅ্যাকশন মূলত বিজ্ঞানের হাতে অণুর ‘ডান’ ও ‘বাঁ’-এর মধ্যে সঠিকটিকে বেছে নেওয়ার এমন এক শক্তিশালী চাবিকাঠি তুলে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতের ওষুধ তৈরিকে বহুলাংশে নিরাপদ ও নিখুঁত করে তুলবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ