বৃহস্পতিবার ● ৮ অক্টোবর ২০২৬
   
শিরোনাম:
● শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের সেরা ঢাবি      ● রাওয়ায় শুরু হলো ১২তম বইমেলা      ● যে ভুলের কারণে বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছে টম ক্রুজের ‘ডিগার’      ● পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের ‘ফাঁদে’ আরও ১৬ ভারতীয় নৌসেনা      ● নানা পাটেকরের সেরা ৮ সিনেমা ও আলোচিত চরিত্র      ● ১৭ বছরের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করেছে বিএনপি সরকার      ● ওসির মৃতুতে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর শোক      ● আইফোন ১৮ প্রো রিভিউ: নতুন ফিচার, দাম ও ভালো-মন্দ      ● আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির রেকর্ডের শেষ নেই      ● ধেয়ে আসা ধ্বংসাবশেষ থেকে যেভাবে রক্ষা পেল বাংলাদেশের স্যাটেলাইট      ● এসএ২০-তে এবারও খেলা হচ্ছে না নাহিদ রানার      ● ছানি অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় ১০ লাখ মানুষ      
মানুষের চাপে উঁচু পাহাড়ে সরে যাচ্ছে মনাল
স্বদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৯ পিএম

মানুষের কর্মকাণ্ড শুধু হিমালয়ের বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত করছে না, তাদের যোগাযোগের ধরনেও প্রভাব ফেলছে। হিমালয়ের পাহাড়ি বনের অন্যতম আকর্ষণীয় পাখি মনালের ওপর ভারতীয় গবেষকদের দুটি গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

মনাল হিমালয় অঞ্চলের সংস্কৃতি, লোকগাথা ও পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। পুরুষ মনালের শরীরে সবুজ, নীল ও তামাটে রঙের দৃষ্টিনন্দন পালক রয়েছে। ভারতের উত্তরাখণ্ডের রাজ্য-পাখি এবং নেপালের জাতীয় পাখি এই মনাল পুরো হিমালয় অঞ্চলে সাংস্কৃতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে অবকাঠামো নির্মাণ ও পর্যটনের বিস্তারের কারণে মনালের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে শব্দদূষণ। এর প্রভাব পড়ছে পাখিটির যোগাযোগের ওপরও। সম্ভাব্য সঙ্গী ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে মনাল তার ডাকের পিচ পরিবর্তন করছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

উত্তরাখণ্ডের গবেষকেরা টানা পাঁচ বছর ধরে পরিচালিত দুটি পৃথক গবেষণায় পাখিটির ওপর জলবায়ু পরিবর্তন, মানুষের বসতি, পর্যটন ও শব্দদূষণের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গাছের সীমানার ওপরের আলপাইন তৃণভূমি মানুষের দখল ও অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে সংকুচিত হওয়ায় মনালকে আরও উঁচু পাহাড়ি এলাকায় সরে যেতে হচ্ছে। অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যস্ত উপত্যকার মানুষের কোলাহল ভেদ করে যোগাযোগ করতে পাখিটি তার ডাকের পিচ বদলাচ্ছে।

হিমালয়ের পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা পরিবেশবিদ বিশাল সিং বলেন, ‘এই দুটি গবেষণা চরম ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য প্রজাতির জন্যও একটি কার্যকর সতর্কবার্তা। মনাল যদি তার কণ্ঠস্বর ও আবাসস্থল দুটিই পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়, তাহলে আরও সংবেদনশীল প্রজাতিগুলো কীভাবে এর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, সেটিও ভাবার বিষয়।’

দুই গবেষণার প্রধান গবেষক ড. রাজীব লোচন জানান, মনালকে গবেষণার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে, কারণ এর আবাসস্থলের পরিসর বেশ নির্দিষ্ট। পাখিটি ঋতুভেদে নিম্ন পার্বত্য অঞ্চল থেকে উচ্চতার আলপাইন অঞ্চলে যাতায়াত করে। ফলে উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশক।

ড. লোচনের ভাষায়, ‘এই নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে যদি এই প্রজাতিটি সমস্যার মুখোমুখি হয়, তাহলে ধারণা করা যায়, বাস্তুতন্ত্রের এই পরিবর্তন অন্য পাখিদেরও প্রভাবিত করছে।’

গবেষকদের মতে, ভঙ্গুর হিমালয় বাস্তুতন্ত্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্য বোঝার ক্ষেত্রেও মনাল গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশক। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও নগরায়ণের কারণে এই অঞ্চলের ওপর মানুষের চাপ বাড়ছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের কারণে হিমালয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটক, ট্র্যাকার ও গবেষকদের আনাগোনা রয়েছে। তবে গত এক দশকে দ্রুত অবকাঠামোগত বিস্তারের ফলে দুর্গম এলাকাগুলোও মানুষের জন্য সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এতে মানুষের চলাচল বেড়ে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। গবেষকদের একটি গবেষণায় জলবায়ুর বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখা গেছে, ২১০০ সাল নাগাদ পুরো ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলে মনালের উপযোগী আবাসস্থল ক্রমাগত কমতে ও অস্থিতিশীল হতে পারে।

বর্তমানে মনালকে পাহাড়ের উঁচুতে অবস্থিত আলপাইন তৃণভূমিতে দেখা যায়। হিমালয়ের এসব তৃণভূমি গুরুত্বপূর্ণ ঋতুভিত্তিক চারণভূমি এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল।

গবেষকেরা জাতিসংঘের জলবায়ু বিজ্ঞান সংস্থা ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) ব্যবহৃত বৈশ্বিক জলবায়ু মডেল ও কার্বন নিঃসরণ পরিস্থিতির ভিত্তিতে একটি মডেল তৈরি করেন। এর মাধ্যমে ভারতের উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল প্রদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মনালের উপযোগী আবাসস্থল কীভাবে বদলে যেতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হয়।

ড. লোচন বলেন, ‘বরফ গলে যাওয়া ও গাছপালার বিস্তারের কারণে পাখিগুলো ধীরে ধীরে হিমালয়ের আরও উঁচুতে উঠে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আলপাইন তৃণভূমিতে মানুষের দখল ও ব্যবহারের কারণে স্বাভাবিক আবাসস্থল হারিয়ে তারা আরও ওপরে যেতে বাধ্য হচ্ছে।’

তবে গবেষকেরা স্বীকার করেছেন, ভবিষ্যতে আলপাইন তৃণভূমির আবহাওয়া মনালের জন্য উপযোগী থাকবে—মডেলটিতে এমন একটি অনুমান করা হয়েছে। এটি যুক্তিসঙ্গত হলেও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মনাল পাহাড়ের আরও উঁচুতে ছোট ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় চলে গেলে তাদের ঋতুভিত্তিক চলাচল কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পাখিগুলো বিচ্ছিন্ন দলে ছড়িয়ে পড়লে পারস্পরিক প্রজননের সুযোগ কমবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে তাদের সংখ্যা কমে যাওয়া কিংবা কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অন্যদিকে ড. রাজীব লোচন, দীনেশ কুমার শর্মা ও আনন্দ কুমারের দ্বিতীয় গবেষণাটি মনালের আচরণগত পরিবর্তনের ওপর আলোকপাত করেছে। উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ কস্তুরী মৃগ অভয়ারণ্যের দুটি উপত্যকায় গবেষণাটি চালানো হয়। এর একটি ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্র চোপতা, যেখানে যানবাহন ও পর্যটকদের কোলাহল বেশি। অন্যটি তুলনামূলক শান্ত মদ্মহেশ্বর।

গবেষকেরা মাইক্রোফোন ও শব্দ রেকর্ড করার যন্ত্র ব্যবহার করে দুই এলাকায় মনালের ৭০০টির বেশি ডাক রেকর্ড করেন। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে এক বছর ধরে এসব রেকর্ডের পিচ, ডাকের স্থায়িত্ব এবং আশপাশের শব্দদূষণের মাত্রা বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে থাকা মনাল শান্ত আবাসস্থলের পাখিদের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চ পিচে ডাকে। গবেষকেরা ডাকের সুর ও পিচে এমন কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন, যা রেকর্ডিং যন্ত্রে ধরা পড়লেও সাধারণ মানুষের কানে সহজে ধরা নাও পড়তে পারে।

তবে ড. লোচন স্পষ্ট করেছেন, এর অর্থ এই নয় যে মনালের কণ্ঠস্বরের কম্পাঙ্কে স্থায়ী বা বিবর্তনগত পরিবর্তন এসেছে। বরং তথ্য বলছে, ভিন্ন শব্দ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পাখিটির আচরণগত অভিযোজনক্ষমতা রয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মদ্মহেশ্বরের পাখিদের তুলনায় চোপতার মনাল ছোট ব্যাপ্তির শব্দ বা ডাক তৈরি করে। মানুষের তৈরি নিম্ন-কম্পাঙ্কের শব্দের মধ্যে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতে এই পরিবর্তন তাদের সহায়তা করতে পারে।

পাখির ডাক তাদের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলে প্রজননসহ স্বাভাবিক আচরণেও প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

ড. লোচন জানান, তাঁর দল এটিকে প্রাথমিক গবেষণা হিসেবে দেখছে এবং ভবিষ্যতে এর পরিধি ও গভীরতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দুটি গবেষণার ফলাফলই ইঙ্গিত দিচ্ছে, হিমালয়ের জীববৈচিত্র্যের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ড ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।




স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close