
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। এর মধ্যেই রিয়াদে বৈঠকে বসেছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর এবং তিন দেশ কীভাবে এর সামরিক সহযোগিতা বাস্তবায়ন করবে—রিয়াদের বৈঠকই তার প্রথম বড় পরীক্ষা।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় গঠিত কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠকটি সোমবার রিয়াদে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে তিন দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নিচ্ছেন।
গত আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার এবং যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহামাদ এলমাসরি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলেও এটিকে বাস্তবে কার্যকর করার বিভিন্ন দিক নিয়ে তিন দেশ এখনও কাজ করছে। রিয়াদের বৈঠক তাই চুক্তির আওতায় সহযোগিতা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
আলোচনায় হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির লড়াই
বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হতে পারে ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের লড়াইয়ে কী ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।
এলমাসরির ভাষ্য, তুরস্ক ও পাকিস্তান সৌদি আরবকে কিছু না কিছু সহায়তা দিতে আগ্রহী হতে পারে। তবে মূল প্রশ্ন হলো—সহায়তার ধরন কী হবে এবং তার পরিমাণ কতটা হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা পুনর্দখলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে। সৌদি আরব ওই অভিযানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে।
এর আগে সৌদি, তুর্কি ও পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারাও রিয়াদে বৈঠক করে তিন দেশের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং হুতিদের হামলার বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পাকিস্তানের সামরিক সহায়তা, তবে বড় প্রশ্ন যুদ্ধের বিস্তার
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। হুতিদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতেও ইসলামাবাদ সামরিক ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষক এলমাসরির মতে, বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো আরেকটি বড় যুদ্ধে তুরস্ক বা পাকিস্তানকে সরাসরি জড়িয়ে না ফেলা।
তিনি বলেন, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ চলার মধ্যে নতুন কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে কেউই আগ্রহী নয়। ফলে সৌদি আরবের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং মিত্র দেশগুলোর সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের মাত্রা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই রিয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের দিকে নজর
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম বৈঠক আগস্টের শেষ দিকে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে তিন দেশ চুক্তির অধীনে সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়েও এগোয়।
এখন ইয়েমেনে দ্রুত বদলে যাওয়া সামরিক পরিস্থিতির মধ্যে রিয়াদের বৈঠক সেই কাঠামোকে বাস্তবে কতটা কার্যকর করা যায়, তা দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হুতিদের সামরিক অগ্রগতি, সৌদি ভূখণ্ডে হামলার ঝুঁকি এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে তিন দেশের সমন্বিত অবস্থান কী হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।
তবে চুক্তি থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে তিন দেশ অবিলম্বে একই মাত্রায় সামরিক অভিযানে অংশ নেবে। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা সমন্বয়, লজিস্টিক সহায়তা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ—কোন ক্ষেত্রে কতটা সহযোগিতা করা হবে, রিয়াদ বৈঠকে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ