
শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসের বরফে ঢাকা পৃষ্ঠের নিচে থাকা লবণাক্ত মহাসাগর দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কাছে প্রাণের সম্ভাব্য আবাস হিসেবে আগ্রহের কেন্দ্র। এবার গবেষণাগারে এনসেলাডাসের পরিবেশের অনুকরণ করে পরিচালিত এক পরীক্ষায় পৃথিবীর কিছু অণুজীবের বেঁচে থাকার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা। এতে এনসেলাডাসে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের গভীর সমুদ্রের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট থেকে সংগ্রহ করা মিথেনোজেন নামের অণুজীব নিয়ে গবেষণাটি চালানো হয়। এসব অণুজীব হাইড্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডকে মিথেনে রূপান্তর করে শক্তি সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে।
গবেষকরা পানি, লবণ, কার্বনেট ও গুঁড়া পাথর মিশিয়ে এনসেলাডাসের ভূগর্ভস্থ মহাসাগরের মতো একটি কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করেন। একই সঙ্গে পানির সঙ্গে পাথরের রাসায়নিক বিক্রিয়াও পুনর্নির্মাণ করা হয়। এ ধরনের বিক্রিয়ার মাধ্যমে হাইড্রোজেন উৎপন্ন হয়, যা মিথেনোজেন অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পরীক্ষায় দেখা যায়, পানির পিএইচ মাত্রা ১১-এ পৌঁছালেও অণুজীবগুলো সেখানে বেড়ে উঠতে পারে। পানিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কম থাকলেও তারা নিজেদের বিপাকক্রিয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়।
মিউনিখের লুডভিগ-ম্যাক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক উইলিয়াম ওরসি বলেন, এনসেলাডাসে পৃথিবীর মতো কোনো জীব থাকলে এমন পরিবেশে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে সেখানে কোনো জীব দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে পারবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এনসেলাডাস নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হলো এর বরফের নিচে থাকা মহাসাগর। নাসার ক্যাসিনি মহাকাশযান এবং জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণে সেখানে লবণাক্ত মহাসাগরের পাশাপাশি পৃষ্ঠ থেকে জলীয় বাষ্প ও বরফকণা বের হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ক্যাসিনির সংগৃহীত নমুনায় জৈব পদার্থের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছিল।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে। গবেষকদের মতে, এনসেলাডাসে অণুজীবের অস্তিত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই গবেষণা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। তবে পরীক্ষাটি মাত্র কয়েক দিন স্থায়ী হওয়ায় অণুজীবগুলো এক বছর বা তারও বেশি সময় এমন পরিবেশে টিকে থাকতে পারবে কি না, তা এখনো অজানা।
একই জার্নালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় বলা হয়েছে, এনসেলাডাসের বাষ্পীয় ফোয়ারা থেকে বের হওয়া বরফকণায় প্রাণের সম্ভাব্য জৈবচিহ্ন ঘনীভূত থাকতে পারে। ফলে ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানে এসব কণা বিশ্লেষণ করে প্রাণের সম্ভাব্য চিহ্ন শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
এদিকে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্রস্তাবিত ‘এলফোর’ মিশনে এনসেলাডাসে একটি ল্যান্ডার পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০৪২ সালের দিকে মিশনটি উৎক্ষেপণ করা হতে পারে। এরপর শনি গ্রহে পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে ২০৫০-এর দশক পর্যন্ত। ফলে এনসেলাডাসে প্রাণের অস্তিত্বের প্রশ্নের আরও নির্ভরযোগ্য উত্তর পেতে বিজ্ঞানীদের অপেক্ষা করতে হতে পারে আরও কয়েক দশক।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি