
শেরপুরের ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। জেলার ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়, নদী ও ঝরনা থেকে নিয়মিত বালু-পাথর সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু-পাথর উত্তোলনের পাশাপাশি সরকারি বনাঞ্চলের গাছও কেটে নেওয়া হচ্ছে। এতে পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে এবং নদী-ঝরনার স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
গারো পাহাড়ে পাথর উত্তোলন প্রায় এক যুগ আগে সরকার নিষিদ্ধ করে। বালু উত্তোলন বন্ধে শেরপুর জেলা প্রশাসন ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ীর সব বালুমহাল বিলুপ্ত ঘোষণা করে। তবে এরপরও বিভিন্ন এলাকায় বালু-পাথর উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে ও গোপনে পাহাড়, নদী ও ঝরনা থেকে বালু-পাথর সংগ্রহ করছে। দিনের বেলায় উত্তোলন করা এসব উপকরণ বিভিন্ন স্থানে জমা করে রাখা হয়। পরে রাতের আঁধারে ঘোড়ার গাড়ি, ভ্যান, ট্রলি, মাহিন্দ্র ও ট্রাকে করে সেগুলো বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।
সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধুটিলা রেঞ্জের বাতকুচি বিট, দাওধারা ও কাটাবাড়ি এলাকায় গত দুই বছরে অন্তত ২৫ হাজার গাছ কেটে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। গাছ কাটার পাশাপাশি এসব এলাকায় পাহাড়ের বিভিন্ন স্থান থেকে বালু-পাথর তোলা হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের গান্ধীগাঁও, দরবেশতলা, হালচাটি, মালিটিলা, বাকাকুড়া, হলদিগ্রাম, গজনী ও ছোট গজনীসহ বিভিন্ন এলাকায় বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে শ্রীবরদীর কর্ণজোড়া, রাঙ্গাজান, বালিজুড়ি, হারিয়াকোণা ও তাওয়াকোচা এবং নালিতাবাড়ীর ভোগাই ও চেল্লাখালী নদীর বিভিন্ন স্থান থেকেও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদীতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকলেও ঝিনাইগাতীতে বালু-পাথর উত্তোলনের প্রবণতা বেশি। বেলচা, কোদালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে শ্রমিকেরা পাহাড় কেটে এবং নদী-ঝরনা থেকে বালু-পাথর সংগ্রহ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
তাদের আরও দাবি, রাতের বেলায় বিপুল পরিমাণ বালু-পাথর বিভিন্ন যানবাহনে করে উপজেলা ও জেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নেওয়া হয়। এতে প্রতিরাতে লাখ লাখ টাকার বালু-পাথর সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অবাধে বালু-পাথর উত্তোলনের ফলে পাহাড়ের গঠন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নদী ও ঝরনার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্টরা।
এদিকে গত ৩ জুন রাতে বালুভর্তি চারটি মাহিন্দ্র জব্দের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বন বিভাগের তিন কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এ ধরনের ঘটনায় বন বিভাগ ও প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন।
কোথাও কোথাও প্রভাবশালীরা প্রশাসনকে প্রভাবিত করে বালু-পাথর উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
শেরপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাইফুল ইসলাম কমল বলেন, জেলায় কোনো বালুমহাল নেই। প্রশাসন সক্রিয় রয়েছে এবং এ ধরনের অপরাধ দমনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ