
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার লুটেরচর ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মো. শামীম বাঁদশাহ। তিনি মরহুম হাজী মো. খোরশেদ আলমের ছেলে এবং চার ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। খুব সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা শামীমের শৈশব ও কৈশোরে বড় কোনো সুযোগ-সুবিধা ছিল না। তবে পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ছিল বরাবরই।
শেখেরগাঁও আব্দুল অদুদ মুন্সী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে মাধ্যমিক এবং দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ২০১৭ সালে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি। পরে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
স্কুলজীবন ছিল আট-দশজন শিক্ষার্থীর মতোই সাধারণ। তবে কলেজজীবনে এসে ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজি বিষয়ের প্রতি আলাদা আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। সেই আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন ইংরেজি কোচিং সেন্টারে পড়াশোনা করে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের পর IELTS পরীক্ষাও সম্পন্ন করেন।

উচ্চশিক্ষা ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা যেমন ছিল, তেমনি ঢাকায় নিজের ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগও ছিল। কিন্তু একসময় তাঁর মনে হয়, নিজের জীবনকে শুধু নিজের জন্য গড়ে তুললে হয়তো ব্যক্তিগতভাবে সফল হওয়া সম্ভব, কিন্তু অন্য কারও জীবন বদলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে না। সেই ভাবনা থেকেই জীবনের গতিপথে পরিবর্তন আনেন তিনি।
গ্রামে ফিরে শামীম দেখতে পান, লক্ষীপুর গ্রামের অনেক ছেলে-মেয়ে ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অবহেলিত এই গ্রামে ভালো মানের শিক্ষকেরও সংকট রয়েছে। গ্রামের যেসব ছেলে-মেয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে, তাদের অধিকাংশই উন্নত জীবনের আশায় অন্যত্র চলে যায়। ফলে গ্রামে থেকে যাওয়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ দেওয়ার মতো মানুষের সংখ্যা কম।
বর্তমান সময়ে ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে শামীম মনে করেন, ইংরেজিতে একজন শিক্ষার্থীর দক্ষতা তৈরি হলে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে তার সামনে নতুন অনেক সুযোগ তৈরি হতে পারে। নিজের অর্জিত জ্ঞান তাই শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
গত ২৫ জুন বাবার মৃত্যুর পর গ্রামের শিশু-কিশোরদের এই অবস্থার কথা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেন শামীম। এরপর আর ঢাকায় ফিরে যাননি। স্কুলজীবন শেষ হওয়ার পর থেকে দীর্ঘদিন ঢাকায় বসবাস করা এবং শহরমুখী জীবনে অভ্যস্ত এই মানুষটি এখন শহুরে জীবন ছেড়ে গ্রামেই অবস্থান করছেন।
গত তিন মাস ধরে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই গ্রামের ছেলে-মেয়েদের বিনামূল্যে ইংরেজি শেখাচ্ছেন তিনি। তবে জীবিকার প্রয়োজনে তাঁর প্রিমিয়াম স্টুডেন্ট ব্যাচও রয়েছে।
শুধু ইংরেজি নয়, গ্রামের শিশুরা যেন ধর্মীয় শিক্ষাতেও পিছিয়ে না পড়ে, সে বিষয়টিও তাঁর উদ্যোগের অংশ। আগের মতো অনেক শিশু এখন সকালে মসজিদে গিয়ে আরবি শিক্ষা নেয় না। তাই শিশুদের শুদ্ধভাবে আরবি শেখানোর জন্য স্থানীয় একজন ধর্মীয় শিক্ষক রেখে বিনামূল্যে আরবি শিক্ষারও ব্যবস্থা করেছেন তিনি। এতে তারা ইংরেজির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আরবি শিক্ষা অর্জন করতে পারে, সূরা-কালাম শুদ্ধভাবে শিখতে পারে এবং সঠিক নিয়মে নামাজ আদায় করতে পারে।
শামীম মনে করেন, একজন আদর্শ ও দায়িত্বশীল শিক্ষক শুধু একটি বিষয় শেখান না, তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ গঠনের পথেও ভূমিকা রাখেন। নিজের সামর্থ্য যতটুকু, সততার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করাকেই তিনি বড় করে দেখছেন।
অজপাড়া গ্রামের ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছু করতে পারাটাই তাঁর কাছে বড় পাওয়া। শিক্ষার্থীদের চোখে শেখার আগ্রহ এবং তাদের মুখে ইংরেজির নতুন কোনো শব্দ বা বাক্য শুনতে পাওয়ার মতো ছোট ছোট মুহূর্তও তাঁকে আনন্দ দেয়।
তাঁর স্বপ্ন খুব বড় কিছু নয়। তিনি চান, লক্ষীপুর গ্রামের এই ছোট উদ্যোগ একদিন লুটেরচর ইউনিয়নের আরও অনেক গ্রামে ছড়িয়ে পড়ুক। এলাকার ছেলে-মেয়েরা যেন শুদ্ধভাবে ইংরেজি পড়তে ও বলতে শেখে, নিজেদের যোগ্যতায় ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে এবং স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
তাঁর বিশ্বাস, একা একজন মানুষের পক্ষে সমাজের সবকিছু বদলে দেওয়া সম্ভব নয়, তবে পরিবর্তনের শুরু একজন মানুষ থেকেই হতে পারে। নিজের জন্য যতটা না, তার চেয়েও বেশি এলাকার ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য কাজ করে যেতে চান তিনি।
নিজের স্বপ্নকে কিছুটা পাশে রেখে অজপাড়া গাঁয়ের সন্তানদের স্বপ্ন পূরণের পথে সহযোগী হওয়ার এই উদ্যোগ অন্যদের মধ্যেও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার অনুপ্রেরণা তৈরি করতে পারে।
শামীম বাঁদশাহ আমাদের এই প্রতিবেদককে বলেন, “অজপাড়া গ্রামের এই ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছু করতে পারছি, এটাই আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। আমি চাই, তারা ইংরেজির পাশাপাশি আরবিতেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করুক, সূরা-কালাম শুদ্ধভাবে শিখুক এবং সঠিক নিয়মে নামাজ আদায় করতে পারুক।
আমার স্বপ্ন খুব বড় কিছু নয়। আমি চাই, আমার এই ছোট উদ্যোগ একদিন লুটেরচর ইউনিয়নের আরও অনেক গ্রামে ছড়িয়ে পড়ুক। একা একজন মানুষের পক্ষে সমাজের সবকিছু বদলে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু পরিবর্তনের শুরুটা একজন মানুষ থেকেই হতে পারে। আমি সেই পরিবর্তনের একজন ছোট্ট সহযোগী হতে চাই।
নিজের জন্য যতটা না, তার চেয়েও বেশি আমার এলাকার ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য কাজ করে যেতে চাই। এই অজপাড়া গাঁয়ের সন্তানদের জন্য নিজেকে সততার সঙ্গে উজাড় করে দিতে চাই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন আমি আমার গ্রামের এই ছেলে-মেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার একজন সত্যিকারের সহযোগী হতে পারি।”
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ