
গ্রিনল্যান্ডে স্নায়ুযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত একটি সাবেক মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে দ্বীপটির পূর্ব উপকূলে থাকা আরেকটি সামরিক ঘাঁটিতেও মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হবে। ঘাঁটি দুটি হলো নারসারসুয়াক ও মেস্টারসভিগ।
যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া একটি নতুন চুক্তির আওতায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
যে দুটি ঘাঁটিতে বাড়বে সামরিক উপস্থিতি
সূত্রগুলো জানিয়েছে, দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের নারসারসুয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো একটি সামরিক স্থাপনা পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ‘ব্লু ওয়েস্ট ওয়ান’ নামে একটি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দেয়। এরপর ওই এলাকার জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে মাত্র কয়েক ডজনে নেমে আসে।
অন্যদিকে পূর্ব উপকূলের মেস্টারসভিগ ঘাঁটিটি বর্তমানে ডেনমার্কের বিশেষ বাহিনীর ‘সিরিয়াস ডগ স্লেড প্যাট্রোল’ ব্যবহার করে। কুকুরের টানা স্লেজ গাড়ি ব্যবহার করে পরিচালিত এই ইউনিটটি গ্রিনল্যান্ডের দুর্গম এলাকায় টহল ও নজরদারির কাজে নিয়োজিত।
নতুন সমঝোতার ফলে এ দুটি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম ও উপস্থিতি বাড়তে পারে।
নিউইয়র্কে চুক্তি সইয়ের কথা
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে।
তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু এখনো প্রকাশ করা হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানিয়েছে, স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত চুক্তির বিস্তারিত বিষয়গুলো চূড়ান্ত নাও হতে পারে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। হোয়াইট হাউসও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
আর্কটিক নিরাপত্তায় ন্যাটোর ভূমিকা বাড়ার ইঙ্গিত
ডেনমার্কের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন চুক্তির মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং অঞ্চলটির নিরাপত্তা পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বৃহত্তর নজরদারি ও কাঠামোর আওতায় আসবে।
বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ার প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ট্রাম্পের চাপের পর সমঝোতা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কয়েক মাসের ধারাবাহিক চাপের পর এই সমঝোতা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগ্রহ ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন। এমনকি গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও তিনি একাধিকবার উড়িয়ে দেননি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসে।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় বড় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ছিল
স্নায়ুযুদ্ধের সময় গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ছিল অনেক বড়। ওই সময় দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি সামরিক স্থাপনা এবং ১০ হাজারের বেশি সেনা সদস্য ছিল।
বর্তমানে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সামরিক স্থাপনা হিসেবে পিটুফিক স্পেস ঘাঁটি রয়েছে। ওই ঘাঁটিতে প্রায় ১৫০ জন মার্কিন সেনা কর্মরত রয়েছেন।
নতুন চুক্তির মাধ্যমে নারসারসুয়াক ও মেস্টারসভিগে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার পরিধি আবারও বিস্তৃত হবে।
গ্রিনল্যান্ড ভৌগোলিকভাবে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় দ্বীপটির সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্ব দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি