আপনার ক্যারিয়ার আপনার নিজস্ব গল্প। সেরা গল্পটি লিখুন।
প্রশ্ন হলো, গল্পটি কীভাবে ভালো লিখব?
ক্যারিয়ার নামের গল্পটি যাতে অনবদ্য হয় সেজন্য দশটি ভাবনা তুলে ধরলাম। মূলত চাকরিজীবীদের জন্য এ পরামর্শ।
১। নিজেকে অনিবার্য করে তুলুনবর্তমান চাকরিতে আসার আগে আমরা বেশ কয়েকজন বন্ধু বিভিন্ন ব্যাংকে প্রবেশনার অফিসার হিসেবে জয়েন করেছিলাম। পরে আমরা কেউ কেউ সিভিল সার্ভিসে চলে এলাম।
যারা রয়ে গেলো তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি এখানেই থাকবে, না অন্য কোথাও যাবে? সে উত্তর দিলো, ‘থাকি ব্যাংকে। দেখা যাক কী হয়।’
কয়েক বছর আগে সে একটি বিখ্যাত মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংকের বাংলাদেশের কান্ট্রি সিইও হলো। এরপর তাকে আরেকটি উন্নত দেশের সিইও হিসেবে বদলি করা হলো। একসময় তার রিটায়ারমেন্ট ঘনিয়ে এলো। কিন্তু তার রিটায়ার করা হলো না। কারণ চাকুরির বয়স শেষ হওয়ার পর পৃথিবী বিখ্যাত ব্যাংকটি তাকে অ্যাডভাইজার হিসেবে ধরে রেখেছে।
সে এখন খুবই সুন্দর একটি দ্বীপরাষ্ট্রে সমুদ্র তীরের বাংলোয় থাকে। অনলাইনে ব্যাংকটির ম্যানেজমেন্টকে পরামর্শ দেয়। মাঝে মাঝে উড়োজাহাজে উড়ে গিয়ে ব্যাংকটির হেডঅফিসে মিটিং অ্যাটেন্ড করে। আমার বন্ধুটি কিন্তু আমার-আপনার মতোই দেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। সে কীভাবে এত ভালো করল যে, অবসরের পরও ব্যাংকটি রাজ্যের সুবিধা দিয়ে তাকে অ্যাডভাইজার হিসেবে রেখে দিলো?
উত্তরটি খুব সিম্পল- সে নিজেকে ব্যাংকের কাছে অনিবার্য করে তুলতে পেরেছিল। তবে এর জন্য তার কত পরিশ্রম, বিনিদ্র রজনী এবং আত্মনিবেদন জড়িয়ে আছে তা কল্পনাও করা যায় না।
২। কাজটিকে ভালোবাসা আমরা যখন ব্যাংকিং পেশায় আনন্দ পাইনি তখন আমার বন্ধুটি তাতেই আনন্দ খুঁজে নিয়েছিল। হিসাবনিকাশের কঠিন জগতকে সে ভালোবেসেছিল। এ ভালোবাসা তাকে উপযুক্ত মূল্য ফেরত দিয়েছে।
কনফুসিয়াসের একটি কথা আছে, ‘কাজকে ভালোবাসলে, কাজ করছি বলে মনেই হয় না।’ তার মানে, কাজে বিরক্তি আসে না। আর কাজে বিরক্তি না এলে উন্নতিকে ঠেকানোর সাধ্য কারো নেই।
আমার বন্ধু কনফুসিয়াসের উপর আস্থা রেখেছিল। তাই তার এত সাফল্য!
৩। সময়মতো কাজ শেষ করাআমার এক বস ছিলেন। খুবই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এ বসের নাম জহির মোহাম্মদ। তিনি একবার আমাকে বলেছিলেন, “দায়িত্ব পালন করতে না পারলে আমি আমার আন্ডারে আইন্সটাইনকেও চাই না। আমি তাকে চাই যে কাজ ঠিক মতো করবে।”
কথাটি খুবই সত্য। যত মেধাবীই হোক, সময় মতো দায়িত্ব পালন করতে না পারলে ক্যারিয়ারের ফলাফল হবে জিরো।
৪। সুসম্পর্কযেকোনো চাকরিতে সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সহকর্মী নয়, ক্লায়েন্ট এবং স্টেকহোল্ডারদের সাথেও ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে।
আমার পরিচিত এক যুবকের প্রত্যাশিত প্রমোশন বারবার আটকে গেছে। তার বস আমার পরিচিত। তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি আমাকে বলেছিলেন, “ওর পিয়ার বা ক্লায়েন্ট রিলেশন কোনোটাই ভালো নয়। এটি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত বোর্ড কখনোই ওকে প্রমোশন দেবে না।”
৫। বস ম্যানেজমেন্টক্যারিয়ারে বস খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই তার প্রতিটি ন্যায়সঙ্গত আদেশ পালন করে তাকে খুশি রাখা উচিত। অযথা বসের সাথে ঝামেলায় যাওয়া, তাকে চ্যালেঞ্জ করা ক্যারিয়ারকে বিপদে ফেলে। তার কোনো সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলাই ভালো। তর্ক করা উচিত নয়।
আমার বড়মামা ছিলেন ব্যাংকার। তিনি আমাকে একটি ঘটনার কথা বলেছিলেন। তা হলো, গত শতকের পঞ্চাশ দশকে দু’বন্ধু তৎকালীন একটি ব্যাংকে একই পদে যোগদান করেছিলেন। এদের একজন বসের সাথে রাগারাগি করে চাকুরিতেই টিকতে পারেননি। আরেকজন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়েছিলেন।
(তবে আমি বলছি না যে, প্রয়োজনে বসের অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাবে না। তবে অপ্রয়োজনে খারাপ সম্পর্ক না করাই ভালো)
৬। ভালো একজন মেন্টর খুঁজে নেওয়াদীর্ঘ চাকরিজীবনে ভালো করতে হলে একজন যোগ্য, অভিজ্ঞ মেন্টর খুঁজে বের করা জরুরি। যিনি পেশাগত জীবনে পরামর্শ দেবেন। ভালো মেন্টরের আলোর ছটায় হাঁটলে সাফল্য অনিবার্য।
৭। শৃঙ্খলা ক্যারিয়ারে ভালো করার জন্য শৃঙ্খলার বিকল্প নেই। যতটুকু দেখেছি, আমার বন্ধুটি খুবই শৃঙ্খলাপরায়ণ। ঝড়বৃষ্টি, রোদ কোনো কিছুই তাকে রুটিনচ্যুত করতে পারেনি। সকল দুর্ভোগের বিষাক্ত বীজ হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। এ বীজ ডালপালা ছড়িয়ে শুধু ক্যারিয়ার নয়, জীবনও ধ্বংস করে দেয়
৮। ওয়ার্ক -লাইফ ব্যালেন্সঃ সাইকেলের দুই প্যাডেল খুব কঠিন সত্য হচ্ছে, পারিবারিক শান্তি না থাকলে কোনো কাজেই ভালো করা যায় না। তাই ক্যারিয়ারে ভালো করতে হলে পারিবারিক শান্তি নিশ্চিত করতে হবে। এটা করার অন্যতম উপায় হলো, ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স। এর কোনোটিকেই অবহেলা করা যাবে না। কাজ ও পরিবার একই সাইকেলের দুইটি প্যাডেল। প্যাডেলগুলোয় ভারসাম্য রাখতে হবে। নয়ত সাইকেল চলবে না।
৯। আউট অব বক্স পড়াশোনাক্যারিয়ারে নিজস্ব পেশা বা ক্ষেত্র সম্পর্কে জ্ঞান যেমন জরুরি, একইসাথে এর বাইরের জ্ঞানও জরুরি। কারণ তা যেকোনো চাকরিজীবিকে স্মার্ট করে তোলে। নিজ কাজে বিশেষজ্ঞ হওয়া খুবই ভালো। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে যদি প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য বিষয়েও পরামর্শ দেওয়ার দক্ষতা থাকে তবে তা এক্সট্রা মাইলেজ দেবে কোনো সন্দেহ নেই।
১০। আজকের কাজই আগামীকে তৈরি করেক্যারিয়ারে যারা ভালো করতে চান তাদের একথাটি মনে রাখতে হবে। আজ আপনি কাজটি ভালোভাবে করলে আগামীকাল আপনি আরো ভালো করবেন। বিপরীত হলে উল্টো হবে।
ইয়োর ক্যারিয়ার ইজ ইয়োর স্টোরি। রাইট ইট ওয়েল। আপনার গল্পটি হোক সেরাদের সেরা।