২০২৫ সালে বাংলাদেশের সামগ্রিক আমদানি প্রবাহ ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ কমে স্থবির অবস্থায় রয়েছে। এলসি নিষ্পত্তির চাপও বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়নি। এই স্থবিরতা শিল্পখাতের রাজস্ব প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে দিয়েছে। সিমেন্ট ও স্টিলসহ অনেক উৎপাদনশীল শিল্প বর্তমানে দেশীয় চাহিদা হ্রাসের কারণে স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতার অনেক নিচে পরিচালিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক BMRE উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও, বহু কারখানা তাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ব্যবহার করছে।
সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোও পূর্ণ গতিতে এগোচ্ছে না, এবং একটি নির্বাচিত সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত এ স্থবিরতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে শিল্প উদ্যোক্তারা BMRE-এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতেও বিরত থাকছেন।
রাজস্ব প্রবৃদ্ধির মন্থরতা কার্যকরী মুনাফাকে দুর্বল করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ঋণ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে, যার ফলে কর্মসংস্থান হ্রাস এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ও মজুরি প্রদানে অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকারি মেগা প্রকল্প নির্ভর শিল্পগুলো সরাসরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তাই আমদানি হ্রাসের এই ধারাবাহিকতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে নিকট ভবিষ্যতে তা গুরুতর সংকট সৃষ্টি করতে পারে, যদি না দ্রুত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
অতীতে আমদানি বাণিজ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ‘আন্ডার-ইনভয়েসিং’ (কম দামে পণ্য দেখিয়ে অর্থপাচার) সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লক্ষণীয়ভাবে কমে এসেছে- যা বাণিজ্য স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি এবং সামগ্রিক আমদানি কার্যক্রমের শ্লথতার কারণে এ উন্নতি সম্ভব হয়েছে।
বিদেশি মুদ্রার ঘাটতির সময় অনেক প্রস্তুতকারক বাধ্য হয়ে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা কাঁচামাল ব্যবহার করেছেন- যা তুলনামূলকভাবে বেশি খরচসাপেক্ষ। অন্যদিকে যারা আমদানি অব্যাহত রেখেছেন, তাদের এলসি নিষ্পত্তিতে উচ্চ বিনিময় হারজনিত অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়েছে। ফলে তাদের মুনাফা মার্জিন এতটাই কমে গেছে যে, ঋণ পরিশোধসহ অন্যান্য দায়সমূহ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
যদি এই স্থবিরতা অব্যাহত থাকে, তবে বেকারত্ব বাড়বে, বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান অধিক ঋণনির্ভর- সেগুলোর অকার্যকর ঋণের (NPL) ঝুঁকি তীব্র হবে। তদুপরি, সম্প্রতি সুদের হারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেওয়ার ফলে ঋণগ্রহীতারা নতুন চাপের মুখে পড়েছেন। এসব কারণে প্রত্যাশিত জিডিপি প্রবৃদ্ধিও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অতএব, সরকারের এখনই লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি- যাতে অর্থনীতির গতি পুনরুদ্ধার করা যায় এবং শিল্পখাত আবারো পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরতে পারে।
লেখকঃ ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
স্বদেশ প্রতিদিন/আইএমএস