চা পাথর সমৃদ্ধ উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলার আনাচে-কানাচে মুক্ত জলাশয়ে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে সাদা, হালকা গোলাপি এবং বেগুনি রঙের মিশ্রণে গঠিত কচুরিপানা ফুল। অযত্ন আর অবহেলায় গড়ে উঠা এ মনোমুগ্ধকর ফুল মানুষের মনের খোরাক জোগাচ্ছে। বাড়ির আশেপাশে, রাস্তার ধারে, মাঠের পাশে ডোবা, খাল-বিল এমনকি সামান্য বদ্ধ জলাশয়ে গড়ে উঠা কচুরিপানায় অসংখ্য ফুল ফুটেছে। যা যে কোনো বয়সের মানুষকে আকৃষ্ট করছে।
দৃষ্টিনন্দন এ ফুল গ্রাম বাংলার অতি পরিচিত একটি জলজ উদ্ভিদ। যা নদ-নদী, পুকুর এবং অন্যান্য জলাশয়ে অযত্নেই ফুটে। ময়ূরের পালকের মতো নান্দনিক রূপের এ ফুল প্রকৃতি প্রেমীদের আকর্ষণ করে। রাস্তার পাশে বা খোলা জলাশয়ে দলবেঁধে ফুটে থাকা কচুরিপানা ফুল এক মনোমুগ্ধকর ও দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যের সৃষ্টি করে। যাতে যে-কোনো পথিক সহজে আটকে যায় এ কচুরিপানা ফুলে। এটি এমন একটি ভাসমান জলজ উদ্ভিদ, যা বিভিন্ন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। উচ্চ উৎপাদনশীলতা এবং দ্রুত প্রজনন ক্ষমতার জন্য এটি সুপরিচিত। এটা এখন সম্পদে পরিণত হয়েছে। বহুবর্ষজীবি জলজ উদ্ভিদ এই কচুরিপানা ও তার ফুল। প্রকৃতির আপন খেয়ালে বেড়ে ওঠা এই ফুল। অযত্ন আর অবহেলিত এই ফুল অনন্য ও শোভাবর্ধনশীল।
অনলাইনের বদৌলতে প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮’শ শতাব্দীর শেষদিকে একজন ব্রাজিলীয় পর্যটকের অর্কিড-সদৃশ ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ব্রাজিল থেকে এটি বাংলায় নিয়ে আসেন। দ্রুত বংশবিস্তারের দরুন খুব অল্প সময়ে এটি দেশের প্রায় প্রতিটি জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ববঙ্গে একটা সময় কচুরিপানার প্রকোপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, এটি নিধনের জন্য বিশেষ আইনও প্রণয়ন করতে হয়েছে সে সময়ের সরকারকে। লোকগীতি গান, প্রবন্ধ ও কবিতাতেও স্থান করে নিয়েছে কচুরিপানা ফুল। ১৩৬১ এর শ্রাবণে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ছাপানো হয়েছিল কচুরিপানার উপর সচিত্র প্রতিবেদন। শ্রী দেবেন্দ্রনাথ মিত্র রচনা করেছেন ‘কচুরি পানা’ নামের একটি বই।
কচুরিপানা গবাদিপশুর উৎকৃষ্ট খাবার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দেয় ঠিক তখনি কচুরিপানা সেই খাদ্যের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। এই কচুরিপানা জলজ উদ্ভিদ। এই উদ্ভিদ কৃষি অর্থনীতিতে বেশ অবদান রাখে। কৃষকরা পানিতে পঁচা কচুরিপানার স্তুপকরে তার উপর কাঁদামাটি দিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে নানা ধরনের শাক-সবজিও ফলায়। ফলে তারা পুষ্টি ও বাড়তি অর্থ আয় করে। তাছাড়া কচুরিপানাকে শুঁকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যও তৈরি করা হয়। কচুরিপানা থেকে তৈরি হচ্ছে টব, ফুলদানি,পাটি, ট্রে, ফলঝুড়ি, ডিম রাখার পাত্র, পাপোশ, মোড়া, টুপি, আয়নার ফ্রেম, ডাইনিং টেবিলের ম্যাটসহ প্রায় ২০ ধরনের পণ্য।
জেলার সদর উপজেলার গড়িনাবাড়ি ইউনিয়নের বোদা পাড়া গ্রামের কৃষক হাসান বলেন, “কচুরিপানা দিয়ে তৈরি জৈব সার জমিতে ব্যবহার করলে ইউরিয়া সার কম লাগে। জমি উর্বর হয়। ফলে ফসল ভালো হয়। কৃষকরা লাভবান হয়।”
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গুলজার রহমান আনসারী বলেন, “কচুরিপানা কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সঠিকভাবে এসব কচুরিপানা সংরক্ষণ করা হলে জৈব সার তৈরি করা যায়। কৃষকরা কৃষি জমিতে এই জৈব সার ব্যবহার করে ভালো ফলন সহ আর্থিকভাবেও লাভবান হতে পারেন। কচুরিপানা খুব দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। এটি প্রচুর পরিমাণে বীজ তৈরি করে, যা ৩০ বছর পরও অঙ্কুরোদ্গম হতে পারে। পানি ও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে কচুরিপানার ফুল প্রায় সারা বছরই ফোটে। তবে বেশি দিন স্থায়ী হয় না। নাজুক ফুল কাণ্ড থেকে ফুলকে আলাদা করলে খুব দ্রুতই নুয়ে পড়ে। এ ফুল জলাশয়ে যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণই মুগ্ধতা ছড়ায়।”
পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুল মতিন বলেন, “কচুরিপানা গবাদিপশুর উৎকৃষ্ট খাবার, জৈবসার হিসেবে খুবই শক্তিশালী, এটা ব্যবহার করে কৃষকগণ ভাসমান শাক-সবজির চাষ করে থাকে। পুকুর ও বিলে কাপ জাতীয় মাছের বাড়তি খাবার হিসাবে কাজে লাগে, এ জলজ উদ্ভিদকে রোদে শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কচুরিপানা ফুল সব বয়সি মানুষকে আকৃষ্ট ও মুগ্ধ করে।”