
নাগরপুরের ঢোল কারিগর হারানো ঐতিহ্যকে বাঁচানোর অদম্য সংগ্রাম
টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার বাবনাপাড়া (বাদ্যকর পাড়া) গ্রামের ৫০ বছর বয়সি শ্রী নিরঞ্জন চন্দ্র দাস, চার দশক ধরে ঢোল তৈরি করছেন। তার হাতে তৈরি মাটির খোলের ঢোল শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়— এটি গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অমূল্য নিদর্শন। কিন্তু খরচ বৃদ্ধি, কাঁচামালের সমস্যা, নতুন প্রজন্মের আগ্রহের অভাব এবং সংসার চালানোর চাপ এই পেশাকে সংকটে ফেলেছে।
শৈশব থেকেই পরিবারের কাছ থেকে ঢোল বানানোর কৌশল শিখেছেন নিরঞ্জন চন্দ্র দাস। তিনি ব্যবহার করেন মাটির খোল, কাঠ বা বাঁশের বলয়, গরুর চামড়া, সুতো বা লোহার বলয় এবং মাটি বা সিমেন্টের মিশ্রণ, যা ঢোলকে শক্তিশালী ও সুরময় করে। প্রতিটি ঢোল তৈরি করতে তার লাগে তিন থেকে পাঁচ দিন। উপকরণ ও শ্রম মিলিয়ে খরচ পড়ে প্রায় ১৬–১৭ শত টাকা, তবে মানের ক্ষেত্রে কোনো আপোষ নেই।
নিরঞ্জন চন্দ্র দাস জানান, “মাটির খোলের ঢোল এখন খুব কম কারিগর বানায়। এতে সুর আলাদা। যারা বোঝে তারা এখনো আমার কাছেই আসে। প্রতিটা বাজার মূল্যের ঢোল আমি ২০০০–২২০০ টাকা দামে বিক্রি করি। তবে সংসার চালানো বেশ কঠিন। সরকারি সহায়তা থাকলে পুরো সিজন ঢোল তৈরি করাও সম্ভব হতো এবং পরিবারের জন্য আয়ও নিশ্চিত হতো।”
তিনি শুধু স্থানীয় নয়— দেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলেও ঢোল সরবরাহ করেন। বিয়ে, পূজা-পার্বণ, নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার ঢোলের চাহিদা সর্বদা থাকে। তার পরিবারের ৫–৬ জন সদস্য মূলত তার ঢোল তৈরি থেকে আয় নির্ভরশীল।
তিনি আরও বলেন, “কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। তবুও ঐতিহ্য ধরে রাখতে কাজ করছি। এটি শুধু পেশা নয়, এটি আমার আত্মার কাজ।”
স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা মনে করেন, এই শিল্পে সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনীর সুযোগ দেওয়া হলে নাগরপুরের ঢোল শিল্প আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। না হলে এক সময় লোকজ সুরের এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বাধ্য।
নাগরপুরবাসীও তাকে শুধু একজন কারিগর নয়, বরং লোকজ ঐতিহ্যের রক্ষক হিসেবে দেখেন। তার হাতে তৈরি ঢোলের সুর যেন গ্রামের রঙিন জীবনকেও ধরে রাখে।
ঢোলের সুরে লুকিয়ে আছে নাগরপুরের গ্রামীণ ঐতিহ্য। কিন্তু খরচ, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ, সংসারের চাপ এবং পুরো সিজন ঢোল তৈরি করার কষ্ট—সব মিলিয়ে এই শিল্প টিকে থাকার পথে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা ছাড়া দেশের ঐতিহ্যবাহী ঢোল শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন।
স্বদেশ প্রতিদিন/ নিয়াজ