
কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রথমবারের মতো বিরল মেঘলা চিতার উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা। ইনানী জাতীয় উদ্যানে ক্যামেরা ট্র্যাপে প্রাণীটির ছবি ধরা পড়ার পাশাপাশি পায়ের ছাপ ও মল থেকেও এর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।
চলতি মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, ইনানী জাতীয় উদ্যানে মেঘলা চিতার উপস্থিতি কক্সবাজারের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১৩ মাস ধরে কক্সবাজারের একটি সংরক্ষিত বনে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে বন অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ এবং জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব গেটিনজেনের গবেষকেরা অংশ নেন।
বন অধিদপ্তরের বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের পরিচালক বিপুল কৃষ্ণ দাস জানান, ইনানী জাতীয় উদ্যানের আয়তন ৭ হাজার ৮৫ হেক্টর। সেখানে ১৫টি ক্যামেরার মাধ্যমে ৩২টি স্থান পর্যবেক্ষণ করা হয়। তিনটি ক্যামেরায় মেঘলা চিতার পাঁচটি ছবি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি পায়ের ছাপ ও মলের নমুনা থেকেও প্রাণীটির উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে।
গবেষণায় মেঘলা চিতা ছাড়াও আরও ২১ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে এশিয়ান হাতি, উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, উল্টোলেজি বানর, লজ্জাবতী বানর, বনবিড়াল, চিতা বিড়াল, শজারু, রেসাস মেকাক, শিয়াল, গন্ধগোকুল, ছোট ও বড় খাটাশ, শূকর, কাঁকড়াভুক বেজি, গোরখোদক, ইরাবতী কাঠবিড়ালি, গেছো চুছো, মায়া হরিণ, দাঁতাল ফেরেট বেজার, ছোট রক্তপেকো বাদুড়, বাদামি কাঠবিড়ালি ও লাল উড়ন্ত কাঠবিড়ালি।
বিপুল কৃষ্ণ দাস বলেন, যেখানে জলাশয় ও পানির প্রবাহ রয়েছে, সেসব এলাকায় অন্যান্য স্থানের তুলনায় বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ইনানী জাতীয় উদ্যানের প্রায় ৩ হাজার হেক্টর এলাকা মেঘলা চিতার বসবাসের উপযোগী, যা উদ্যানটির মোট আয়তনের প্রায় ৪৪ শতাংশ। বিশেষ করে ঘন ঝোপঝাড় ও গাছপালায় সমৃদ্ধ এলাকায় প্রাণীটির উপস্থিতির সম্ভাবনা বেশি। গবেষণায় এমন বনভূমির পরিমাণ পাওয়া গেছে ২ হাজার ৮৮৭ হেক্টর।
মেঘলা চিতা বাংলাদেশে মহাবিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত। বৈশ্বিকভাবেও প্রাণীটি ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনাঞ্চলে এদের দেখা যায়। শরীরে মেঘের মতো বড় বড় ছোপ থাকায় প্রাণীটির এমন নামকরণ হয়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময় গাছের ওপর কাটায় তারা। বানর, পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী এদের প্রধান শিকার।
বন্যপ্রাণী গবেষক রেজা খান বলেন, মেঘলা চিতা অত্যন্ত বিরল প্রাণী। ইনানীর বনে এর উপস্থিতি প্রমাণ করে, সেখানে এখনো কিছু এলাকায় সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র টিকে আছে। তার মতে, প্রাণীটির আবাসস্থল চিহ্নিত করে বিশেষ সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি কাঠ আহরণ বন্ধ এবং অবৈধ বসতি থাকলে তা সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও জরুরি।
রেজা খান আরও বলেন, একসময় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার বনাঞ্চল একটি বৃহৎ বনভূমির অংশ ছিল। পরে বিভিন্ন কারণে সেগুলো খণ্ডিত হয়ে যায়। মেঘলা চিতা মূলত গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে শিকার করে এবং খুব কম সময় মাটিতে নামে। তাই ইনানীর বনে এ প্রাণীটি গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ শিকারি হিসেবে ভূমিকা রাখছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে ইনানী জাতীয় উদ্যানের চারপাশে রয়েছে নানা হুমকি। মানুষের বসতি, রোহিঙ্গা শিবিরের সম্প্রসারণ, জ্বালানির জন্য গাছ কাটা এবং কৃষিজমির জন্য বনভূমিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের আনাগোনা ও কৃষিকাজ বেশি এমন এলাকায় বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে কম।
গবেষকেরা অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বনভূমি দখল বন্ধ, পাহাড়ি ছড়া ও খাল সংরক্ষণ এবং উদ্যানের চারপাশে বাফার জোন তৈরির সুপারিশ করেছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে রাঙামাটি থেকে পাচারকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা একটি মেঘলা চিতা বর্তমানে কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে রয়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে উপকূলীয় এই বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও বিরল স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলো ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ