প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৫, ৪:৫৮ AM

মিশরের দক্ষিণাঞ্চলীয় আসওয়ান প্রদেশের নীলনদের তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক আবু সিম্বল মন্দিরে মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) ভোরে অনুষ্ঠিত হলো এক অনন্য প্রাকৃতিক ও স্থাপত্যিক বিস্ময়—ফেরাউন রামসেস দ্বিতীয়ের মুখে সরাসরি সূর্যের রশ্মি পতনের বিরল দৃশ্য। এই অনিন্দ্যসুন্দর মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করতে মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করেন হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমী।
প্রভাতের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের সোনালি রশ্মি মন্দিরের প্রবেশদ্বার পেরিয়ে প্রায় ৬০ মিটার ভেতরে গিয়ে গর্ভগৃহে প্রবেশ করে ফেরাউন রামসেস দ্বিতীয়ের মুখমণ্ডল আলোকিত করে তোলে। প্রায় ২০ থেকে ২১ মিনিট স্থায়ী এই দৃশ্য যেন প্রকৃতি, স্থাপত্য ও জ্যোতির্বিদ্যার এক অপূর্ব সংলাপ।
প্রায় ৩,২০০ বছর আগে, খ্রিষ্টপূর্ব ১২৭৪ সালের দিকে নির্মিত এই আবু সিম্বল মন্দির প্রাচীন মিশরীয় স্থাপত্যকৌশল ও জ্যোতির্বিদ্যার এক অসাধারণ নিদর্শন। বিশাল পাথর খোদাই করে তৈরি এই মন্দিরের নকশা এমনভাবে করা হয়েছিল যে, প্রতি বছর দু’বার—২২ ফেব্রুয়ারি ও ২২ অক্টোবর—সূর্যের প্রথম রশ্মি গর্ভগৃহে গিয়ে আলোকিত করে রামসেস দ্বিতীয়ের মুখ, তবে মৃতদের দেবতা প্থাহের মূর্তি থাকে অন্ধকারে।
গবেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারির দিনটি রামসেস দ্বিতীয়ের সিংহাসনে আরোহণের দিন, আর অক্টোবরের ঘটনাটি তাঁর জন্মদিনের স্মারক। এই নিখুঁত স্থাপত্য পরিকল্পনা প্রমাণ করে প্রাচীন মিশরীয়দের জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও ধর্মীয় প্রতীকবাদের অভূতপূর্ব দক্ষতা।
আবু সিম্বল মন্দিরের ইতিহাসে রয়েছে আরও এক বিস্ময়কর অধ্যায়। ১৯৬০-এর দশকে আসওয়ান হাই ড্যাম নির্মাণের সময় মন্দিরটি ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়লে ইউনেসকোর উদ্যোগে আন্তর্জাতিক প্রকল্পের মাধ্যমে সেটিকে ৬৫ মিটার উঁচু পাহাড়ের ওপর টুকরো টুকরো করে স্থানান্তর করা হয়। স্থানান্তরের পরও সূর্যের রশ্মি পতনের সঠিক সময় ও কোণ অক্ষুণ্ণ রাখা প্রকৌশল ইতিহাসে এক নজিরবিহীন সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই বিরল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা ঘিরে প্রতিবছর পালিত হয় ‘আবু সিম্বল সূর্য উৎসব’। উৎসবকে কেন্দ্র করে মন্দির প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে সংগীত, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায়। ভোর থেকে হাজারো দর্শনার্থী অপেক্ষা করেন সেই মহামুহূর্তের জন্য, যখন সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছুঁয়ে যায় প্রাচীন ফেরাউনের মুখ।
প্রতিবারের মতো এবারও এই প্রাকৃতিক ও স্থাপত্যিক বিস্ময় মনে করিয়ে দিয়েছে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অমর প্রতিভা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও শিল্পকলার মহিমা—যা আজও মানব সভ্যতার এক অনন্য গৌরবগাথা।
স্বদেশ প্রতিদিন / কেআইকে