
মানুষ জন্মগতভাবেই রাজনৈতিক মৌলবাদী। রাজনৈতিক চিন্তা ও দলীয় দর্শনের প্রতি আনুগত্য তার মনে জন্মগত প্রবণতার মতোই কাজ করে। একটি শিশু যেমন জন্মের পরপরই মা–বাবার মুখ চিনে নেয়, তেমনি সমাজে বড় হতে হতে মানুষ দল, মতাদর্শ বা কোনো এক রঙিন পতাকার ছায়াতলে খুঁজে পায় নিজেকে।
মানুষের জীবনে নিরাপত্তা, পরিচয় এবং ক্ষমতা, এই তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দলীয়তা তাকে এই তিনের স্বাদ দেয়। দল মানে শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটি গোষ্ঠী, একটি মতবাদ বা একটি ক্যাম্প। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, “গোষ্ঠী ছাড়া মানুষ অচল।” একক সত্তা হিসেবে মানুষ দুর্বল। তাই সে অবচেতনভাবে নিজের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নেয়, যেটি তার চিন্তাভাবনা নির্ধারণ করে দেয়। এবং এখান থেকেই জন্ম নেয় রাজনৈতিক মৌলবাদ।
আদর্শগত অবস্থানকে অনেক সময় মানুষ ‘যুক্তির’ জায়গায় বসাতে চায় না, বরং ‘আনুগত্যের’ জায়গায় বসায়।
একজন সমর্থক তার দলের সিদ্ধান্ত, নীতি কিংবা ব্যর্থতাকেও ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রায়শই যুক্তিকে এড়িয়ে যায়। সে ভাবে, “আমার দল ভুল করতে পারে না।”
এই প্রবণতাই রাজনৈতিক মৌলবাদের শিকড়কে মজবুত করে। মানুষ তখন আর বহুমাত্রিকভাবে ভাবতে পারে না। দলীয় চিন্তাই হয়ে ওঠে তার ভাবনার একমাত্র মানদণ্ড।
একজন দলীয় ব্যক্তি যখন নিজের মতের বাইরে অন্য কোনো মতামত শোনে, তখন অনেক সময় তার প্রতিক্রিয়া হয় শত্রুতার মতো। ফলে সমাজে দেখা দেয় দলীয় বিভাজন৷ এই বিভাজন ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব এমনকি পারিবারিক সম্পর্ককেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। মতভেদকে যুক্তির জায়গায় না দেখে শত্রুতা হিসেবে দেখাই হলো রাজনৈতিক মৌলবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
বিশ্ব ইতিহাসে ধর্মীয় মৌলবাদের সঙ্গে রাজনৈতিক মৌলবাদের আশ্চর্য মিল রয়েছে। যেমন- মধ্যযুগীয় ধর্মযুদ্ধ কিংবা আধুনিক যুগের শীতল যুদ্ধ, সবকিছুর মূলে ছিল কোনো না কোনো মতবাদকে একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা।
বাংলাদেশ কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও একই ছবি স্পষ্ট। একবার একটি দল ক্ষমতায় গেলে অন্য দলের সমস্ত কিছু অগ্রহণযোগ্য মনে করে। তাদের মতামতকে মাটিচাপা দিতে চেষ্টা করে। উচ্চকন্ঠকে থামিয়ে দিতে প্রতিষ্ঠা করে আয়নাঘর। তাতেও কাজ না হলে জীবন পর্যন্ত কেড়ে নিতে দুইবার ভাবে না।
প্রশ্ন জাগে, মানুষ কি কখনো দলীয় দর্শনের বাইরে চিন্তা করতে শিখতে পারে? তাত্ত্বিকভাবে হ্যাঁ, কিন্তু বাস্তবে খুব কঠিন। কারণ মানুষ যুক্তির চেয়ে আবেগ দিয়ে বেশি চালিত হয়। সমাধান হতে পারে শিক্ষা, মুক্তচিন্তার চর্চা, এবং বহুমতকে মূল্য দেওয়ার অভ্যাস তৈরি করা। তবে তা কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্ভব। সমাজব্যবস্থায় এর প্রভাব ফেলতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘ সময়, ধৈর্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর।
মানুষের রাজনৈতিক মৌলবাদ জন্মগত প্রবণতা বলেই মনে হয়, কারণ তার গঠনেই গোষ্ঠী নির্ভরতা প্রোথিত। দলীয় দর্শন ছাড়া চিন্তা করার ক্ষমতা সীমিত, কারণ সেই দর্শনই তাকে পরিচয় দেয়।
তবুও মানুষ যদি নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে শেখে, তবে মৌলবাদের কড়াকড়ি থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব। অন্যথায়, মানুষ চিরকাল একই বৃত্তে ঘুরে বেড়াবে, যেখানে সত্যি বা মিথ্যার বিচার নয়, দলীয় মতামতই হবে চূড়ান্ত সত্য।
লেখক ও সমাজ গবেষক
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম