
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশাটি দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। একসময় এই পেশাকে বলা হতো “চতুর্থ স্তম্ভ”, যার কলম সমাজে ন্যায়, সত্য ও জনগণের কণ্ঠস্বরকে সামনে নিয়ে আসে। অথচ আজ সেই কলমধারীই বহু ক্ষেত্রে গণরোষ, হুমকি কিংবা মব সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংবাদিকদের উপর হামলা, নির্যাতন এবং জনতার হাতে নিপীড়নের নানা খবর গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন জাগে- কেন সাংবাদিকরা এত বেশি ঝুঁকির মুখে? এর পেছনে কী সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা কাজ করছে?
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা যেমন সংকুচিত হচ্ছে, তেমনি মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী কিংবা উত্তেজিত জনতার হাতে নির্যাতিত হচ্ছেন। অনেক সময় একটি ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ বা লাইভ কাভারেজ করতে গিয়ে তারা হঠাৎ জনতার রোষানলে পড়েন। আবার কোনো অনিয়ম উন্মোচন করলে তার ফল হয় মব-ধরনের প্রতিশোধ।
২০২৪ সালের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশে লিঞ্চিং ও মব-হিংসার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মিথ্যা গুজব কিংবা ক্ষণিক আবেগে ক্ষিপ্ত হয়ে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। একইসঙ্গে সাংবাদিকদের উপরও এই প্রবণতা বেড়েছে। যেহেতু তারা তথ্য সংগ্রহে ঘটনাস্থলে প্রথম পৌঁছান, তাই অনেক সময় তারা হয়ে ওঠেন সহজ শিকার।
সামাজিক অসহিষ্ণুতা:বাংলাদেশে মত প্রকাশের জায়গা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। একটি সংবাদ যদি কারও পছন্দ না হয়, সঙ্গে সঙ্গে সেই সাংবাদিককে শত্রু ভাবা হয়। জনগণের মধ্যে ভিন্নমত গ্রহণ করার মানসিকতার অভাব সাংবাদিকদের সহজ টার্গেটে পরিণত করছে।
গুজব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম:ডিজিটাল যুগে কয়েক মিনিটেই ভুয়া খবর ভাইরাল হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী মহল বা উসকানিদাতারা সাংবাদিককে “মিথ্যাবাদী” বা “বিকৃত সংবাদদাতা” বলে চিহ্নিত করলে উত্তেজিত ভিড় মুহূর্তেই হামলা চালায়।
রাজনৈতিক উত্তেজনা:বাংলাদেশে সাংবাদিকরা প্রায়ই রাজনৈতিক সংঘাত কাভার করেন। কোনো পক্ষের অনিয়ম তুলে ধরলে বিপরীত পক্ষের ক্ষোভের শিকার হন। রাজনৈতিক কর্মীদের উসকানিতে জনতা সরাসরি সাংবাদিককে আক্রমণ করতে পিছপা হয় না।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি:সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- হামলার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হয় না। মামলা হলেও দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ কিংবা আইনি দুর্বলতায় অপরাধীরা শাস্তি পায় না। এর ফলে হামলাকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
প্রশাসনিক নিরাপত্তাহীনতা:অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে থাকলেও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। এমনকি হামলার পরও প্রশাসনিক উদ্যোগ যথেষ্ট দৃশ্যমান হয় না।
সাংবাদিকদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা:সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। একেক সংগঠন ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাবাধীন। ফলে হামলার ঘটনায় ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না।
বিশ্ব সাংবাদিকতা স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নাজুক। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF) ২০২৪ সালে বাংলাদেশকে ১৬৫তম স্থানে রেখেছিল। ২০২৫ সালে তা উন্নীত হয়ে ১৪৯তম হলেও এখনো পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে—সাংবাদিকদের উপর হামলা, মামলা ও ভীতি প্রদর্শন এ দেশের সংবাদমাধ্যমের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
মব সন্ত্রাস: উদাহরণ ও প্রভাব২০২৪ সালে একাধিক সাংবাদিক মাঠপর্যায়ে কভারেজ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় ক্যামেরা ভাঙচুর, লাইভ সম্প্রচার বাধাগ্রস্ত করা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “ভুয়া খবর প্রচার করছে” বলে সাংবাদিকদের ছবি ভাইরাল করে তাদের টার্গেট বানানো হয়েছে। আদালত প্রাঙ্গনে জনসম্মুখে সাংবাদিকের উপর হামলা ইত্যাদি।
এইসব ঘটনায় সাংবাদিকরা শুধু পেশাগত ঝুঁকিতেই পড়েন না, তাদের পরিবারও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অনেক সাংবাদিক মানসিক আঘাত থেকে পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অনেক সাংবাদিক ঘরবাড়ি ছাড়া, দেশান্তরি।
আইনের কার্যকর প্রয়োগ:প্রথমত, সাংবাদিকদের উপর হামলার প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে হামলা বন্ধ হবে না।
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন:একটি বিশেষ আইন দরকার, যেখানে সাংবাদিকদের মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা, তথ্য সংগ্রহে বাধা না দেওয়া এবং হামলার শাস্তির বিষয় স্পষ্ট থাকবে। যদিও এটি নিয়ে সরকার কিছু প্রদক্ষেপ নিচ্ছে তবুও তা নিয়ে রয়েছে অনেক প্রশ্ন ও উৎকন্ঠা।
প্রশাসনিক উদ্যোগ:পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরও দায়বদ্ধ হতে হবে। সাংবাদিকদের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
গুজব দমন ও সচেতনতা:সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতনতা ছাড়া গুজবের বিস্তার থামানো যাবে না।
সাংবাদিকদের পেশাগত সংহতি:সব সংগঠনকে রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা প্রশ্নে একক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে।
জনগণের সচেতনতা:জনগণকে বোঝাতে হবে-সাংবাদিককে আক্রমণ মানে আসলে নিজের তথ্যাধিকারকেই ধ্বংস করা। সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে সমাজ অন্ধকারে ঢেকে যাবে।
সাংবাদিকরা যদি নিরাপদ না থাকেন, তবে সমাজে সত্য প্রকাশের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। আর সত্যের মৃত্যু হলে মিথ্যা, গুজব ও স্বৈরতন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। সাংবাদিকদের উপর মব সন্ত্রাস বন্ধ করা শুধু একটি পেশার স্বার্থ নয়- এটি আসলে দেশের অস্তিত্ব ও মুক্তচিন্তার বাঁচা-মরার প্রশ্ন।
রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম- সব পক্ষকেই এখন একই জায়গায় এসে দাঁড়াতে হবে। সাংবাদিক নিরাপদ থাকলেই তথ্য নিরাপদ থাকবে, আর তথ্য নিরাপদ থাকলেই জনগণ ও রাষ্ট্র নিরাপদ থাকবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম