
দেশের রাজনীতিতে প্রতিদিনেই পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট। একের পর এক ইস্যূতে উত্তপ্ত হচ্ছে রাজপথ। এর উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনীতির আনাচে কানাচে। দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত এক বছরে অধ্যক্ষ-প্রধান শিক্ষকসহ প্রায় সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। মব করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্তত আড়াই হাজার শিক্ষককে। এ ছাড়া বিভিন্ন ইস্যুতে ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ, বিভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধসহ টানা আন্দোলন আর শিক্ষকদের শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনা ঘিরে এই সময়ে উত্তাল ছিল দেশের শিক্ষাঙ্গন, যার ছোঁয়া লাগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও। নতুন করে চট্টগ্রামসহ দেশের অন্তত সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দেশের শিক্ষাঙ্গনে হঠাৎ করে উত্তপ্ত হওয়ায় শিক্ষার্থী শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে।
সূত্রমতে, গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ায় কথায় কথায় আন্দোলনে নামছেন, যার কারণে উত্তাল হয়ে উঠছে শিক্ষাঙ্গন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) এলাকায় শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আহতের সংখ্যা দুই শতাধিক। এর মধ্যে কিছু সংখ্যক ছাড়া বাকিরা প্রায় সবাই শিক্ষার্থী। আহত শিক্ষার্থীদের অনেকে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। তাদের বেশ কয়েকজন এখন ভর্তি আছেন আইসিইউতে। অনেকের হাত-পা ভেঙে ও থেঁতলে গেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অন্তত অর্ধশত শিক্ষার্থীর মাথায় ধারালো অস্ত্রের কোপের আঘাত রয়েছে। পাঁচ শিক্ষার্থীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের মাথায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। আনুমানিক শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছে। তাদের মধ্যে অর্ধশত শিক্ষার্থীর শরীরে ধারালো অস্ত্রের কোপের চিহ্ন রয়েছে। তাদের বেশিরভাগই মাথায় ও হাতে আঘাতপ্রাপ্ত। পাঁছ-ছয়জন আছেন বেসরকারি হাসপাতালের আইসিউতে।
আহতদের মধ্যে এক শিক্ষার্থীর মাথার মগজ কেটে যাওয়ায় তাকে ঢাকায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। ১০ শিক্ষার্থীর হাত-পা ভেঙে ও থেঁতলে গেছে। কয়েকশ শিক্ষার্থীকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। হামলায় আহত হয়েছেন শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। আহত শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই গতকাল সোমবার বিকেল পর্যন্ত চমেক হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে ভর্তি। গুরুতর আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতাল পার্কভিউ, ন্যাশনাল হসপিটাল ও মেট্রোপলিটন হাসপাতালে।
গত এক বছরে দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্তত ২৬টি সংঘর্ষ, নয়টি আন্দোলন এবং তিনটি হত্যাকাণ্ড ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরাই তুচ্ছ ঘটনায় ১৫ বার সংঘর্ষে জড়িয়েছে। গত এক বছরে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল শিক্ষার্থীদের সচিবালয়ে ঢুকে ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ছয়টি বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করানো এবং সেগুলোতে অটোপাস আদায় করা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালেও পরীক্ষায় অটোপাস চায় শিক্ষার্থীরা, যদিও সরকার তাতে সায় দেয়নি।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। আমাদের প্রক্টর ও প্রোভিসি (একাডেমিক) আহত। তারা হেলমেট পরে ছাত্রদের ধরে ধরে কুপিয়েছে। আমরা রাত থেকে প্রশাসনের সঙ্গে অনেক যোগাযোগ করেও তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমাদের শত শত শিক্ষার্থী হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। তিনি বলেন, যুবলীগ নেতা হানিফের অনুসারী সন্ত্রাসীরা সরাসরি ধারালো অস্ত্র হাতে এ হামলা চালায়। আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। গুরুতর আহতদের বিশেষ চিকিৎসা নিশ্চিতে খোঁজখবর রাখছে প্রশাসন।
সংঘর্ষে আহতদের অনেকে ভর্তি আছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ক্যাজুয়েল্টি বিভাগে। এরমধ্যে ভাষা বিজ্ঞান (২০২৪-২৫) সেশনের শিক্ষার্থী সিয়াম আহমেদ, বাংলাদেশ স্টাডিজ (২০১৯-২০) সেশনের মুহাম্মদ রোমান রহমান, বাংলাদেশ স্টাডিজ (২০২১-২২) সেশনের তাওহিদুল ইসলাম, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স (২০২০-২১) সেশনের মোহাম্মদ ইসমাঈল ও ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনশিপ (২০২০-২১) সেশনের সাকিব আহমেদ রয়েছে।
পরিকল্পিতভাবে এ হামলায় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। শত শত লোকের হাতে ধারালো অস্ত্র তাৎক্ষণিক আসার কথা নয়। শিক্ষার্থীদের প্রকাশ্যে কুপিয়েছে এলাকার সন্ত্রাসীরা। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ এ হামলা চালিয়েছে। গত রোববার দুপুর ১২টার দিকে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠে ক্যাম্পাস এলাকা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন।
ংঘর্ষের কারণে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সব পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তারা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে এ হামলায় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। শত শত লোকের হাতে ধারালো অস্ত্র তাৎক্ষণিক আসার কথা নয়। শিক্ষার্থীদের প্রকাশ্যে কুপিয়েছে এলাকার সন্ত্রাসীরা। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ এ হামলা চালিয়েছে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের। তারা বলছেন, স্থানীয় ক্যাডাররা এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা নিরীহ শিক্ষার্থীদের মেস থেকে বের করে পিটিয়েছে।
এদিকে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে জারি করা ১৪৪ ধারার মেয়াদ আরও এক দিন বাড়ানো হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম জানিয়েছেন, এই আদেশ আজ মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। তবে তিনি এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি বলে জানান। সংঘর্ষের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং এর আশপাশের জোবরা গ্রামে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ এবং অনেক স্থানীয় বাসিন্দা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় ও আশেপাশের এলাকায় যৌথবাহিনীর সদস্যরা টহল দিচ্ছেন।
সূত্রমতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাবলিক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পদত্যাগে চাপ তৈরি হয়। কেউ পদত্যাগ করতে না চাইলে তাকে নির্যাতন ও অপমান করা হয়। শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানোর এসব ঘটনা রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিলেও এ অবস্থা চলেছে প্রায় বছরজুড়েই। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাঠামো। এখনো অনেক শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে মারামারি, শিক্ষকদের আন্দোলন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সংঘর্ষ, শিক্ষার্থীরা সময়মতো বই হাতে না পাওয়াসহ নানা ঘটনায় শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সাত কলেজ নিয়ে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে রাজধানী ছিল উত্তাল। ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে ভাঙচুরসহ শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ ছিল অন্যতম আলোচিত ঘটনা।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সংঘর্ষের জেরে ৩৭ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার ইস্যুতে উত্তপ্ত হয় দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে ৩৭ শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হয়, অপসারিত হন উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যও। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে মে মাসে সরিয়ে দেওয়া হয় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শুচিতা শরমিন, সহ-উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম রব্বানী এবং কোষাধ্যক্ষ মো. মামুন অর রশিদকে।
এর বাইরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানজুড়ে সংঘর্ষ, অবরোধ ও আন্দোলনের ঝড় বইছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসু নির্বাচন ঘিরে তুলকালাম, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনশন-হুঁশিয়ারি, ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রেলপথ অবরোধ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) সর্বাত্মক শাটডাউনসহ শিক্ষক সংগঠনের মহাসমাবেশে একাধিক দাবিতে সরব শিক্ষাঙ্গন। এমন পরিস্থিতিতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তহীনতায় পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠে। এর আগে কম্বাইন্ড (সমন্বিত) ডিগ্রির দাবি পূরণ না হওয়ায় বাকৃবি উপাচার্যসহ দুই শতাধিক শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রাখে টি অনুষদের শিক্ষার্থীরা। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত শিক্ষকেরা অবরুদ্ধ ছিলেন। এর আগে দিনে দুবার ট্রেন অবরোধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থীরা।
বহিরাগতদের হামলায় উত্তপ্ত বাকৃবি: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি ও পশুপালন অনুষদের সিংহভাগ শিক্ষার্থীই একক কম্বাইন্ড ডিগ্রির দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন করে আসছিলেন। পরবর্তীতে এই সমস্যা নিরসনে গত রোববার একাডেমিক কাউন্সিলের আয়োজন করেন বাকৃবি প্রশাসন। অধিকাংশ শিক্ষার্থী শুধুমাত্র একটি একক ডিগ্রির দাবি করলেও কাউন্সিলের সভায় বাকৃবি প্রশাসন বিএসসি ইন এনিমেল হাজবেন্ড্রি, ডক্টর অফ ভেটেরিনারি মেডিসিন (ডিভিএম) ও কম্বাইন্ড ডিগ্রি চালুর কথা বলে। এই সিদ্ধান্ত আন্দোলনকারীরা তাদের দাবির সাথে সাংঘর্ষিক মনে করেন এবং দুপুর ১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় আড়াইশো জন শিক্ষককে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বহিরাগতদের হামলার শিকার হন। পরে রাত সাড়ে ৯ টায় অনলাইনে অনুষ্ঠিত জরুরী সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং সকল ছাত্র-ছাত্রীদের গতকাল সোমবার সকাল ৯ টার মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ প্রদান করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই আদেশের প্রেক্ষিতেই সকাল ৭টা থেকেই হল ছাড়তে শুরু করেন বেশকিছু নারী ও প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীর। তবে সকাল ৯ টা ১০ মিনিটে বিভিন্ন হল থেকে দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের কে আর মার্কেটে জড়ো হন। এসময় শিক্ষার্থীরা ‘রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘রাজপথ ছাড়বো না’, ‘প্রশাসনের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে’সহ বিভিন্ন ধরনের ¯েøাগান দিতে থাকেন এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেন।
পরবর্তীতে বেলা সাড়ে ১১ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সংবাদ সম্মেলনে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবি হলো- অবৈধভাবে হল ভ্যাকেন্টের নির্দেশনা দুপুর ২ টার মধ্যে প্রত্যাহার করে আদেশ তুলে নিতে হবে, হলগুলোতে চলমান সব ধরনের সুবিধা নিরবিচ্ছিন্ন রাখতে হবে, এই প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উপর শিক্ষকদের মদদে বহিরাগত দিয়ে হামলার দায়ে প্রক্টোরিয়াল বডিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ করতে হবে, বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দ্বারা ককটেল বিস্ফোরণ, লাইব্রেরি ও স্থাপনা ভাঙচুর এবং দেশীয় অস্ত্র দ্বারা শিক্ষার্থীদের উপর হামলা এবং নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্তার ঘটনার জন্য উপাচার্যকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে, হামলার সাথে জড়িত শিক্ষকবৃন্দ: কৃষি অনুষদের আসাদুজ্জামান সরকার স্যার, তোফাজ্জল স্যার, শরীফ আর রাফি স্যার, কামরুজ্জামান স্যার, পশুপালন অনুষদের বজলুর রহমান মোল্যা স্যার, জেনেটিক্সের মুনির স্যার, ডেইরি বিজ্ঞান বিভাগের আশিকুর রহমান স্যার এবং বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে এবং গত ১ মাস ধরে চলমান যে একক কম্বাইন্ড ডিগ্রির দাবিতে আন্দোলন করে আসছি, সেই একক ডিগ্রি অবিলম্বে প্রদান করতে হবে। তিনটি ভিন্ন ডিগ্রি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শিক্ষার্থীরা জানায়, এই ছয় দফা দাবি দ্রুত মেনে না নিলে পুরো বাকৃবি লকডাউন এবং ব্লাকআউট করে দেয়া হবে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি, তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ছি না।
বিকেলে সাড়ে ৪টায় পশুপালন ও ভেটেরিনারি অনুষদের ছাত্র-ছাত্রীদের কম্বাইন্ড ডিগ্রীর দাবী নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সুপারিশ এর প্রেক্ষিতে গত ৩১ আগস্ট তারিখ অনুষ্ঠিত একাডেমিক কাউন্সিলের সভা পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতি একটি বিবৃতির মাধ্যেমে কর্তৃপক্ষীয় ভাষ্য প্রদান করেছে।
এদিকে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ১৫০ একর জমি অধিগ্রহণ, পরিবহন সংস্কার এবং তিন মাসের মধ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডির সব কাজ সম্পন্ন করার দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি মেনে না নিলে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। রোববার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাউন্ড ফ্লোরে সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আমিনুল ইসলাম, ববি শাখার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক আহŸায়ক রাকিব আহমেদ এবং গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের শাখা সংগঠক। এক সপ্তাহ ধরে মাঠের আন্দোলনে বিএসসি (স্নাতক) ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা। বিএসসি (স্নাতক) প্রকৌশলীরা ঢাকা ও জেলা শহরের কলেজ চত্বরে সমাবেশ ছাড়াও বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। আন্দোলনের জেরে বুয়েটসহ কয়েকটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। অচলাবস্থা বিরাজ করছে বিভিন্ন পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানেও।
বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে আলোচনায় থাকা ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা চলতি মাসেও সংঘর্ষ-হাতাহাতিতে জড়িয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও বিএম কলেজ, যাত্রাবাড়ীতে তিন কলেজ, প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ও ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এবং চট্টগ্রাম কলেজসহ বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও গত এক বছরে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। এর বাইরে প্রাথমিক থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন বৈষম্য নিরসন, এমপিওভুক্তি, চাকরি জাতীয়করণ, বদলি নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং পেনশন স্কিমের মতো বিভিন্ন দাবিতে গত এক বছর ধারাবাহিক আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেছেন। এই সময়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের সমাবেশ, কর্মবিরতি, অনশন থেকে শুরু করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। বেতন স্কেলের ১১তম গ্রেডের দাবিতে কয়েক দফা সমাবেশ করার পর গত শনিবার ২৬ দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মহাসমাবেশ থেকে শিক্ষক নেতারা হুঁশিয়ারি দেন, দাবি মানা না হলে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে আমরণ অনশনে যাবেন তারা।
এমপিওভুক্তির দাবিতে এক বছরে একাধিকবার কর্মসূচি দিয়েছেন বেসরকারি শিক্ষকরা। এর আগে ফেব্রæয়ারিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা বৃদ্ধি এবং বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও শ্রান্তি বিনোদন ভাতা কার্যকরের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে টানা ২২ দিন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এর আগে জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনরত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরা শাহবাগে মিছিল বের করলে পুলিশের হামলার শিকার হন, যদিও পরে তাদের দাবি মেনে নেয় সরকার। জুনে ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার ভাইভার ফলে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামেন অনুত্তীর্ণ প্রার্থীরা। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে তাদের বিক্ষোভে পুলিশ জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে।
জাতীয়করণের আওতায় বাদ পড়া প্রায় ৫ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জুনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে তাদের দাবি আদায়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এক পর্যায়ে শিক্ষকদের ছত্রভঙ্গ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এপ্রিলে বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবিতে বাংলাদেশ টিচার্স সোসাইটি (বিটিএস) মানববন্ধন ও আন্দোলনের ডাক দেয়। ৫ আগস্টের পর বেসরকারি স্কুল ও কলেজ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া শিক্ষকরা তাদের পুনর্বহাল এবং নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদানের দাবিতে কয়েক দফা আন্দোলন করেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর