
পুরুষ মানুষের জীবন এক বৈচিত্র্যময়। সংসারের ঘানি টানতে টানতে অর্ধেকটা জীবন শেষ হয়ে যায়। এর মাঝে যদি রাষ্ট্রীয় আইনের বেড়াজালে পড়ে তাহলে তার পুরো জীবনটাই ধ্বংস হয়ে যায় এর পর আবার কেউ কেউ বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে আসার স্বপ্ন দেখেন। যুবক বয়সে মামলা করেন মো. মজিবুর রহমান। আদালতের বারান্দায় ঘুরেছেন সিটি জরিপের মামলা হইতে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যাল, ঢাকা, প্রথম মোকদ্দমা, ল্যান্ড সার্ভে মোকদ্দমা নং- ৯৩২/২০০৯। বিজ্ঞ ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যাল, ঢাকা, দ্বিতীয় মোকদ্দমা, ল্যান্ড সার্ভে মোকদ্দমা নং- ২৭৮৫/২০০৯। (বদলী) বর্তমান ২য় সিনিয়র সহকারী জজ আদালত দেওয়ানী মামলা নং-১৯৫/২৪। উক্ত দুটি মামলার সুরাহার জন্য মোট ২৬ বছর আতদালতে আসা যাওয়া করছেন। বয়সের ভারে বৃদ্ধ হলেও সেই মামলার রায় আজও পাননি। ন্যায় বিচার প্রার্থী উক্ত ২ মামলার বাদী মো. মজিবুর রহমান এখন হতাশ হয়ে পড়েছেন।
দৈনিক স্বদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে এই ষাটোর্ধ বৃদ্ধের গল্প। বর্তমানে তাহার বয়স ৬১ বছর। তিনি গুলশান থানাধীন শাহজাদপুর এলাকার মৃত মো. শামসুল হকের ছেলে মো. মজিবুর রহমান।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, দেওয়ানী মামলা/জরিপ মামলা হইতে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যাল চলমান ২৬ বছর যাবৎ আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন তবু কোন সুরাহা পাচ্ছেন না। মামলা চলাকালীন সময়ে নানারকম হুমকির শিকার হয়ে সমস্যার সম্মুখীন হন। তার মনে একটি সংশয় দেখা দিয়েছে বেঁচে থাকতে তিনি কি উক্ত ২টি মামলার রায় দেখে যেতে পারবেন নাকি পরকালে পাড়ি জমাবেন। ১৯৯৯ সালে প্রথম মোকদ্দমা ল্যান্ড সার্ভে মোকদ্দমার নং- ৯৩২/২০০৯ বিবাদিগণ নুর মোহাম্মদ গং জমি জোরপূর্বক দখল করেন।
দ্বিতীয় মোকদ্দমা ল্যান্ড সার্ভে মোকদ্দমা নং- ২৭৮৫/২০০৯ (বদলী) বর্তমান ২য় সিনিয়র সহকারী জজ আদালত দেওয়ানী মামলা নং-১৯৫/২৪ বিবাদিগণ মাজাহারুল ইসলাম গং সহ কয়েকজন জমি জোরপূর্বক দখল করেন। ভুমিদস্যু ওই চক্রটি জমি দখল নেন। বিষয়টি সমাধানের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হন। তারপর থেকেই আদালতে যাওয়া আসা শুরু হয় মো. মজিবুর রহমানের।
আইনজীবীদের দোষারোপ করে তিনি বলেন, ‘বাদি ও বিবাদী উভয় পক্ষের আইনজীবীদের অসোহযোগিতার জন্য মামলা শেষ হতে দেরি হয়। মামলা যতদিন চলবে ততদিন টাকা পাবে। মামলা শেষ হলে তো আর টাকা পাবেনা আইনজীবীরা। তাই ওনারা টাকা ইনকামের জন্য মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থা করেন না।
ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা মামলা প্রসঙ্গে মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার জমির জাল দলিল করে জবরদখল করে রেখেছে। এছাড়াও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জবরদখল করার জন্য জাল দলিল ও ভুয়া কাগজপত্র করায় মামলা হয়রানির শিকার হচ্ছে অনেক সাধারণ মানুষ। প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারনেই এই মামলাগুলো দীর্ঘায়িত হয়। এই বিষয়ে সরকার জবরদখলকারী ও জাল দলিল করা ব্যক্তিদের দশ লক্ষ টাকা জরিমানা এবং দশ বৎসরের কারাদণ্ড প্রদান করে দেওয়ানী মামলা সংশোধন করলে সারাদেশে দেওয়ানী মামলাগুলো ৫০% হ্রাস পাবে। বর্তমান রুজুকৃত মামলা অর্ধেকের বেশি সমাধান হয়ে যেত। বিশ্বস্বস্তসূত্রে জানা যায়- ভূমি সংক্রান্ত ব্যাপারে সারাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১২০০-১৫০০ জন খুন হচ্ছে এবং ফৌজদারি মামলার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। প্রবাসে ১ কোটি ২৫ লক্ষ লোক অনেকে জমি ক্রয় করে হতাশাগ্রস্ত, কারণ ক্রয়কৃত জমি জবর দখল হয়ে যাচ্ছে।
কেন দেওয়ানি মামলা দীর্ঘায়িত হয় সে প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আহসান হাবীব বলেন, ‘ব্রিটিশদের তৈরি করা আইনানুযায়ী আমাদের আদালত পরিচালিত হচ্ছে। এই আইনের কারণে দেওয়ানি আদালতের মামলা নিষ্পত্তি করতে সময় লাগে। এছাড়া দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট থেকে অধস্তন সব আদালতে মামলার সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি বিচারকের সংখ্যা।
সিভিল মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করার কোন আইন রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী আহসান হাবীব বলেন, ‘সিভিল মামলার অনেকগুলো ধারার সংশোধনী করা হয়েছে। দ্রুত সময়ে অল্প খরচে মামলার নিষ্পত্তি করতে সিভিল প্রসিডিউর কোড সংশোধন করা হয়েছে। যার মাধ্যমে এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।’
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর