
দীর্ঘ ছয় বছর সৌদি আরবে ছিলেন, কিন্তু ভাগ্য বদলায়নি। ফিরে এসেছেন খালি হাতে। তবে মন খালি ছিল না। মনের ঝাঁপিটায় ছিল মরুভূমির এক টুকরো স্মৃতি- সৌদি খেজুর। সেই স্মৃতিই হয়ে উঠেছে শেখ শোকর আলীর জীবনের মোড় ঘোরানোর প্রধান হাতিয়ার।
সাতক্ষীরা শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে, কালীগঞ্জ উপজেলার মৌতলা ইউনিয়নের নহরকাটি গ্রামের বাঁশের সাঁকো পার হয়ে গেলে দেখা মেলে শোকর আলীর খেজুরবাগান ঘেরা ছোট্ট এক আশ্চর্য ভুবনের। আশেপাশে সৌদি খেজুর গাছের সারি, আঙিনাজুড়ে সাজানো চারা। গ্রামের মানুষ যাকে ভালোবেসে ‘শুকচান’ বলে ডাকেন, তিনিই এখন এলাকার অনুপ্রেরণা।
সেই ভাবনা থেকেই মরিয়ম জাতের সৌদি খেজুরের ৪৫টি বীজ সাথে করে দেশে নিয়ে আসেন। সৌদিতে খেজুরবাগানে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল, সেটিই কাজে লাগিয়ে বীজ রোপণ করেন নিজের আঙিনায়। চার বছরের মাথায় আসে প্রথম ফল।
শোকর আলীর দুই ছেলে, একজন সৌদি আরব ও আরেকজন বাহরাইনে থাকে। তারা বীজ পাঠান, আর শোকর আলী সেগুলো রোপণ করে চারা উৎপাদন করেন। এখন তার বাড়ির আঙিনায় রয়েছে শতশত গাছ ও চারা। প্রতিদিনই কেউ বাড়িতে লাগানোর জন্য, আবার কেউ মৎস্য ঘেরের ভেড়িতে রোপণ করার জন্য চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
সরেজমিনে বাগান ঘুরে দেখা যায়, একটি গাছের ছয়টি কান্দিতে ধরেছে মরিয়ম জাতের সৌদি খেজুরের, যেগুলো এরই মধ্যে পাকতে শুরু করে খেজুরের গায়ে হলুদাভ রঙ ধরেছে। তিনি বলেন, ওই ছয়টি কান্দিতে ৩৫ থেকে ৪০ কেজি খেজুর রয়েছে। আরও অনেক গাছেই ফল ধরেছে। তবে গাছ বড় করতে এবং কান্দির সংখ্যা বাড়াতে কিছু গাছ থেকে খেজুর কেটে ফেলা হয়েছে।
শোকর আলী বললেন, ‘এই খেজুর চাষে বিশেষ কোনো বাড়তি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। দেশি গাছে যেভাবে যত্ন করতে হয়, মরিয়ম খেজুরের ক্ষেত্রেও তাই। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় বছরে ফল এলে কেটে ফেলতে হয়, না হলে গাছ বড় হয় না।’
তার কাছে মরিয়ম, আজুয়া, মাশরুম ও মেডজুলসহ মোট ৮ ধরনের সৌদি খেজুরের চারা রয়েছে। শোকর আলীর মতে, যুবসমাজ যদি বিদেশে না গিয়ে দেশের উর্বর মাটিতে এই খেজুর চাষে মনোযোগ দেয়, তাহলে আরও বেশি লাভবান হবেন।
তার একজন কর্মচারী জানান, অর্ডার পেলেই চারা পৌঁছে দেয়া হয়। অনলাইনেও চারা বিক্রি করা হয়।
কালীগঞ্জ উপজেলার সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ রানা জানান, লবণসহিষ্ণু এলাকায় এই খেজুরের ফলন ভালো হয়। যত্নও সহজ, ফলনও ভালো। ফলে যুব সমাজসহ সকলেই এই চাষ করতে পারবে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই এই চাষের সম্প্রসারণ ঘটবে।
শোকর আলীর বসতভিটা ১৫ কাঠা জমির ওপর। এর মধ্যে প্রায় ১২ কাঠা জুড়ে খেজুরের চারা রোপণ করেছেন। গত বছর থেকে নিয়মিত চারা বিক্রি শুরু করেছেন তিনি। জেলার বাইরেও অনেকে চারা কিনতে আসছেন। প্রতিটি চারা ২০০ থেকে ৮০০ টাকা, কোনোটি ১ হাজার ২০০ টাকায়ও বিক্রি হয়। ছোট-বড় মিলিয়ে তার নার্সারিতে এখন প্রায় ১৬ হাজার মরিয়ম খেজুরের চারা রয়েছে। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য আলাদাভাবে দুই বিঘা জমি ইজারাও নিয়েছেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম