
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে কূটনৈতিক সমাধানের কথা বললেও, তার বার্তার ভাষায় উঠে এসেছে সামরিক হুমকির ইঙ্গিত। এতে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত অভিপ্রায় কী?
গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশাল’-এ লেখেন, “আমরা কূটনৈতিক সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনার নতুন পর্বেরও ইঙ্গিত দেন তিনি। তবে এর ১৪ ঘণ্টা পরই, ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা চালায়, ট্রাম্প জানান—ইরানকে তিনি ৬০ দিনের সময়সীমা দিয়েছিলেন, তা শেষ হয়ে গেছে।
রোববার তিনি বলেন, “ইসরায়েল ও ইরানকে চুক্তিতে আসতেই হবে—আমার সহায়তায় সেটা সম্ভব।” পরদিন, কানাডায় অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলন থেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই ওয়াশিংটনে ফেরার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, “ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। সবাই যেন তেহরান ত্যাগ করে!” তবে পরে তিনি জানান, তার ফেরা যুদ্ধবিরতির আলোচনার জন্য নয়, বরং “এর চেয়েও বড় কিছু” নিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র কি আগে থেকেই জানত?
ট্রাম্প হামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়। স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলি আনসারির ভাষ্য, “যুক্তরাষ্ট্র জানত। সময়টা হয়তো চমক ছিল, কিন্তু অনুমতি বা চোখ টিপে সম্মতির মতো কিছু ছিলই।”
তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইসরায়েল যেন নিজের মতো এগোয়, এবং দায়ও তাদের ওপর থাকে।”
এদিকে ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরানের নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনার উপরের অংশ ধ্বংস করেছে, যেখানে ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হতো। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) জানিয়েছে, ভূগর্ভস্থ অংশেও ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, যদিও ফোরদো স্থাপনার ক্ষতি হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোরদোর মতো পাহাড়ের নিচের স্থাপনাগুলো ধ্বংসে ইসরায়েলের সক্ষমতা সীমিত। এ কাজে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩,৬০০ কেজির Massive Ordnance Penetrator-এর মতো বোমা প্রয়োজন—যা এখনো ইসরায়েলকে দেওয়া হয়নি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক বারবারা স্ল্যাভিন বলেন, “ইসরায়েলের যদি লক্ষ্য থাকে পুরো পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, তবে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সাহায্য অপরিহার্য।”
ট্রাম্পের কৌশল: জয়ীদের পাশে থাকা
সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা রিচার্ড নেফিউ মনে করেন, “ট্রাম্প সবসময় জয়ীদের পাশে থাকতে চান। ইসরায়েল জয়ের পথে থাকলে, তিনিও তাদের পাশেই থাকবেন।”
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান পাঠিয়েছে, রণতরী মোতায়েন করেছে এবং মঙ্গলবার আরও যুদ্ধবিমান পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
আলি আনসারির মতে, “হয়তো ট্রাম্প এই সফলতা থেকে কিছু কৃতিত্ব কুড়াতে চাইছেন। এমনকি সরাসরি হামলার হুমকিই ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারে।”
‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছাড় দেওয়া সম্ভব, ইসরায়েলের কাছে নয়’
আনসারি বলেন, “ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু ছাড় দিয়ে সম্মান বজায় রাখতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলের কাছে নতিস্বীকার তাদের জন্য অসম্ভব, যদিও পরিস্থিতি তেমনই বাধ্য করতে পারে।”
সিনেটের উদ্বেগ: যুদ্ধ না কূটনীতি?
এদিকে মার্কিন সিনেটর টিম কেইন সোমবার কংগ্রেসে ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজল্যুশন’ উত্থাপন করেছেন, যাতে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিষিদ্ধ করা হয়।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কেবলমাত্র চূড়ান্ত প্রয়োজনে যুদ্ধেই জড়ানো উচিত।”
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি আর সামরিক প্রস্তুতির মধ্যে দ্বন্দ্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্পষ্টতা ইসরায়েল-ইরান সংঘাতকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ