
ভারতের গুজরাট রাজ্যে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ফের আলোচনায় এসেছে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং। দুর্ঘটনার পর বোয়িংয়ের ‘ড্রিমলাইনার’ সিরিজ নিয়ে পুরনো অভিযোগ ও নিরাপত্তা সংশয় আবার সামনে এসেছে।
‘মেডে’ সংকেতের পরই বিধ্বস্ত হয় ড্রিমলাইনার
বৃহস্পতিবার (১২ জুন) দুপুরে আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করা এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট AI171 উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ কক্ষে 'মেডে' সংকেত পাঠায়। এরপরই বিমানটি গুজরাটের একটি আবাসিক এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার মডেলের এই ফ্লাইটে ২৪২ জন আরোহী ছিলেন।
ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ডিজিসিএ) জানায়, বিমানটি চালাচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন সুমিত সাভারওয়াল, যার উড়ানের অভিজ্ঞতা ছিল ৮,২০০ ঘণ্টা। সহকারী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ক্লাইভ কুন্ডার, যাঁর অভিজ্ঞতা ১,১০০ ঘণ্টা।
দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে এটি ভারতের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ বেসামরিক বিমান দুর্ঘটনা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফের বিতর্কের মুখে বোয়িং
দুর্ঘটনার পর ফের সামনে এসেছে বোয়িংয়ের ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ নিয়ে পুরনো অভিযোগ। কোম্পানির সাবেক প্রকৌশলী ও হুইসেলব্লোয়ার স্যাম সালেহপুর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে (FAA) জানান, ৭৮৭ সিরিজ নির্মাণে একাধিক শর্টকাট নেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
সালেহপুরের অভিযোগ, বিমানের কাঠামোর (ফিউজলেজ) কিছু অংশ ভুলভাবে সংযুক্ত হয়েছে, যা কয়েক হাজার ফ্লাইটের পর ভেঙে পড়তে পারে। বোয়িং যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, ‘৭৮৭-এর কাঠামোগত অখণ্ডতা নিয়ে অভিযোগগুলো ভুল।’
অভিযোগ ও তদন্তের ইতিহাস
২০১৯ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে বোয়িংয়ের দক্ষিণ ক্যারোলিনার কারখানার হুইসেলব্লোয়ারদের বরাতে জানায়, সেখানে নিরাপত্তা উপেক্ষা করে দ্রুত উৎপাদনের চাপ ছিল। FAA এসব অভিযোগে তদন্ত করে। পাশাপাশি দেখা হয়, বোয়িং রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত রেকর্ডে কোনো জালিয়াতি করেছে কি না।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে বোয়িংয়ের ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ৩৪৬ জন প্রাণ হারান। এরপর থেকেই কোম্পানিটি নিরাপত্তাজনিত সংকটে রয়েছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আলাস্কা এয়ারলাইন্সের একটি নতুন বোয়িং ৭৩৭ বিমানে মাঝ আকাশে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বোল্ট অনুপস্থিত থাকার ঘটনা ঘটে, যা আবারও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রশ্ন তোলে।
বোয়িংকে আরও ‘জবাবদিহির আওতায়’ আনার ঘোষণা
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনোনীত FAA প্রধান জানান, বোয়িংয়ের ওপর আরও কঠোর নজরদারি আরোপ করা হবে। বর্তমানে ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানের মাসিক উৎপাদনের সীমা ৩৮ ইউনিটে রাখা হয়েছে, যা শিগগিরই তোলা হবে না বলেও জানানো হয়।
বাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া
দুর্ঘটনার পর নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে বোয়িংয়ের শেয়ারদর প্রাক-বাজার লেনদেনে ৮ শতাংশ কমে যায়। ভারতীয় সময় বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে কোম্পানির প্রতি শেয়ার মূল্য দাঁড়ায় ২১৪ ডলার।
এয়ার ইন্ডিয়া ও বোয়িং: পুরনো সম্পর্ক
২০০৬ সালে এয়ার ইন্ডিয়া বোয়িংয়ের কাছ থেকে ৬৮টি বিমান কেনার অর্ডার দেয়, যার মধ্যে ২৭টি ছিল ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার। প্রথম চালান আসে ২০১২ সালে। প্রতিটি বিমানে ২৫৬টি আসন রয়েছে। চলতি বছর এয়ার ইন্ডিয়া পুরনো ড্রিমলাইনারগুলো প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা করছিল।
এছাড়া, এপ্রিলে বোয়িং যেসব বিমান চীনা কোম্পানিগুলোকে বিক্রি করতে পারেনি, সেগুলোর কিছু কিনতে আলোচনা চালায় এয়ার ইন্ডিয়া।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ