
আর্থিক সংকটে থাকা দেশের পাঁচটি ইসলামি ব্যাংককে একীভূত করে একটি বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং প্রাথমিকভাবে মূলধনের জোগান দেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ঈদের ছুটির পর শুরু হতে যাওয়া এই প্রক্রিয়ার আওতায় এসব ব্যাংকের সম্পদ ও দায় হস্তান্তর, শাখা একীভূতকরণ এবং জনবল পুনর্বিন্যাস করা হবে।
বুধবার (৫ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক বৈঠকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের ডেকে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন ব্যাংকের অধীনে স্থানান্তর হবে পাঁচ ব্যাংকের আমানত ও সম্পদ। এ প্রক্রিয়ার অনুমোদন দেওয়া হবে ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর আওতায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একীভূত ব্যাংকটির প্রধান লক্ষ্য হবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে (এসএমই) অর্থায়ন। নতুন ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের নিচে রাখতে কার্যকর সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির (এএমসি) মাধ্যমে খারাপ ঋণগুলো আলাদা করে হস্তান্তর করা হবে।
নতুন ব্যাংক গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে মূলধন জোগাবে সরকার ও বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীরা। এজন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করলে ধাপে ধাপে শেয়ার ছেড়ে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, এই পাঁচ ব্যাংকের রয়েছে ৭৭৯টি শাখা, ৬৯৮ উপশাখা, ৫০০ এজেন্ট এবং এক হাজার এটিএম বুথ। এসব ব্যাংকে ৯২ লাখ গ্রাহকের হিসাব রয়েছে। আমানতের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, তবে ঋণের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর বড় একটি অংশই খেলাপি।
বিশেষ করে ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯০ শতাংশ ঋণ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের একটি বড় অংশের ঋণ এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে। অপরদিকে এক্সিম ব্যাংকের ১০ শতাংশ ঋণ সংশ্লিষ্ট সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে।
ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে শক্তিশালী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন জানান, "এই একীভূতকরণের আগে কোনো ব্যাংক নিজেকে শক্তিশালী হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।"
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, "দেশে একটি বড় ইসলামি ব্যাংকের প্রয়োজন ছিল। এ উদ্যোগে সম্ভাবনা রয়েছে, যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।"
তবে সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী সতর্ক করে বলেন, “জবাবদিহি না ফিরলে শুধু একীভূত করলেই আর্থিক খাত ঠিক হবে না। যদি রাজনৈতিক লুটপাটের সংস্কৃতি না থামে এবং মৌলিক সংস্কার না হয়, তাহলে ব্যাংকগুলো আবারও সংকটে পড়বে।”
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যেই বিদেশি নিরীক্ষকদের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই করা হয়েছে। কোনো ব্যাংকের আপত্তি থাকলে তা জানানোর সুযোগ থাকবে। তবে কেউ নিজেকে আর্থিকভাবে সবল প্রমাণ করতে না পারলে তাকে একীভূত হতে হবে।
অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক কিছুটা আর্থিক অগ্রগতির দাবি করেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর