
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর রমেশ একটা কথা বলেছিলেন, "তুমি যখন অন্যের বিচার করবে, তখন কখনোই তোমার দৃষ্টিকোণকে সর্বজনীন মনে করোনা।" এই উক্তিটি ঠিক যেন বাংলাদেশের বর্তমান মিডিয়া ট্রায়াল ও অনলাইন জন-আদালত পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের সমাজে যখন একটি ঘটনা ঘটে, তখন তা শুধুমাত্র সংবাদপত্রের পাতা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ তখন নতজানু হয়ে বসে থাকে, একে অপরকে প্রশ্ন করে, বিচার করে, হয়তো অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে যখন একজন সেলিব্রেটি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন, তার পরবর্তী সময়ের চিত্র ছিল এক অনলাইন জন-আদালতের দৃষ্টান্ত। তার বিরুদ্ধে প্রচারিত অভিযোগ একেবারে অপরাধের সীমানা স্পর্শ করে, যদিও তার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছিল না। এই ধরনের বিচার প্রক্রিয়া শুধু একজন ব্যক্তির মর্যাদাকে নষ্ট করে না, বরং পুরো জাতির আইনি আস্থাকে ধ্বংস করে দেয়।
মিডিয়া ট্রায়াল ও অনলাইন জন-আদালত বর্তমান সমাজে একটি মারাত্মক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে। একদিকে এটি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিচার-বোধকে জাগ্রত করেছে, অন্যদিকে এটি ন্যায়বিচারের সঠিক পথকে বিকৃত করেছে। অপরাধের প্রমাণ না থাকলেও মিডিয়ার মাধ্যমে একজন অভিযুক্তকে অজানা এবং অসম্মানজনক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলানো হচ্ছে। যেমন ২০১৮ সালে, যখন একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল এবং তা এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তার ক্যারিয়ার ধ্বংসের কারণ হয়, তা প্রমাণিত হয়নি যে ভিডিওটি আসল ছিল। এই ঘটনায়, একদিকে যেমন মিডিয়ার ভূমিকা ক্ষতিকর ছিল, অন্যদিকে জনগণও সঠিক বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে চলে গেছে। এই ঘটনা একটি বৃহৎ সমাজব্যবস্থার চিত্র তৈরি করেছে, যেখানে জনগণ, মিডিয়া, এবং ন্যায়বিচারের মধ্যে সঠিক সিমানা আর অবশিষ্ট নেই। এটি সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলার জন্য একটি বড় হুমকি।
বিশেষ করে, বাংলাদেশে যেখানে আইন ও ন্যায়বিচারের জন্য মানুষের বিশ্বাস অনেকটাই দুর্বল, সেখানে মিডিয়া ট্রায়াল এবং অনলাইন জন-আদালত এই বিশ্বাসকে আরও নড়বড়ে করে তুলছে।যদি এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে, তবে ভবিষ্যতে সমাজে বৃহৎ ক্ষতি হতে পারে। এটি একদিকে যেমন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মর্যাদার উপর আঘাত হানবে, তেমনি অন্যদিকে এটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব তৈরি করবে। যেমন এক ব্যবসায়ী, যার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়ায় এক অভিযোগ উঠেছে, তাকে তার কর্মজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে হবে। তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে, তার নাম কলঙ্কিত হবে, এবং সমাজে তাকে একদম তুচ্ছ হিসেবে দেখা হবে, যদিও তার অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই ক্ষতি করবে না, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উপরও প্রভাব ফেলবে। জনসাধারণের মধ্যে আইনি সিস্টেমে আস্থা থাকলে তবেই অর্থনৈতিক উন্নতি সম্ভব। তাই এই সমস্যার সমাধান না হলে বাংলাদেশের মানবাধিকার ও অর্থনীতি দুইই সংকটাপন্ন হয়ে যাবে।
নির্বিচারে গুজব ছড়ানো এবং অপপ্রচার চালানো একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে, যার ভয়াবহ উদাহরণ হচ্ছে ময়ূর রঞ্জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া তথ্য ও মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২২ সালে রহমান বলেছেন যে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার কার্যক্রম অনেক সময় যাচাই-বাছাইহীন ও উদ্দেশ্যমূলক বিদ্বেষ ছড়ানোর মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে । ২০২১ সালে হক এবং আহমেদ তাদের গবেষণায় ব্যাখ্যা করেন যে, মিডিয়া ট্রায়াল কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া নয়, কিন্তু এটি জনমতকে প্রভাবিত করে বিচারপ্রার্থীর ন্যায্য বিচারের অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে । এ ধরনের অপপ্রচার এবং মিথ্যাচার শুধু ব্যক্তিপর্যায়ে নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নমূলক অর্জনের বিরুদ্ধেও চক্রান্তের অংশ হিসেবে দেখা যায়। ময়ূর রঞ্জনের মত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত এই অপপ্রচার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার একটি ষড়যন্ত্রমূলক কৌশল যা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস তার কর্মজীবনে সবার জন্য ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন, "যে সমাজে বিশ্বাস নেই, সেখানে ন্যায়বিচারেরও অস্তিত্ব নেই"। তিনি গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পুরো পৃথিবীতে গণমানুষের জন্য অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথ তৈরি করেছেন। তার মতে, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে এটি একটি সমাজে ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক হতে পারে। ডঃ ইউনূসের উদাহরণ আমাদের শেখায় যে, মিডিয়া ও সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলো যদি জনগণের জন্য সদর্থক কাজ করতে পারে, তবে এটি সমাজের উন্নতি ঘটাবে, তবে যদি তা আদালতের বিকৃতি ঘটানোর জন্য ব্যবহার করা হয়, তবে তা সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
মিডিয়া ট্রায়াল ও অনলাইন জন-আদালত একটি চ্যালেঞ্জের মতো আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এটি সমাজে বিচারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। তবে সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। ডঃ ইউনূসের মতো নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে, আমরা একটি সুষ্ঠু, ন্যায়বিচারপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারি। “ন্যায়বিচারের জন্য আমাদের কখনও পিছিয়ে যাওয়ার অধিকার নেই, বরং একে আরও শক্তিশালী করতে হবে।”
লেখক:
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব (ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক ও অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর) এবং দাউদ ইব্রাহিম হাসান (আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসি-এর মার্কেটিং বিভাগের সদস্য)।
স্বদেশ প্রতিদিন/আইএমএস