
স্বামীকে হারিয়ে চার সন্তানকে আগলে রেখেছেন মা নুরজাহান বেগম। সেই সন্তানদের একজন ব্যাংকার, একজন চিকিৎসক, আরেকজন শিক্ষকতা করেছেন। আর ছোট ছেলে মিজানুল ইসলাম চুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করে কুয়েটে শিক্ষকতা ছেড়ে বিসিএসের প্রস্তুতি নেন। প্রথমবার ব্যর্থ হলেও থেমে যাননি। ৪৫তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য গেজেটভুক্ত হয়েছেন তিনি।
মোহাম্মদ ইউসুফ মারা যান ২০০৬ সালে। জনতা ব্যাংকে কর্মরত স্বামীর মৃত্যুর পর চার সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন নুরজাহান বেগম। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মধ্যম গুয়াপঞ্চকের সেই পরিবারে তখন বড় ছেলে নজরুল ইসলাম টিটু শিক্ষার্থী। আর সবার ছোট মিজানুল ইসলামের বয়স মাত্র আট বছর। পড়তেন তৃতীয় শ্রেণিতে।
স্বামীকে হারানোর শোক সামলে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন নুরজাহান বেগম। চার সন্তানকে নিয়ে তাঁর পথচলা সহজ ছিল না। তবে প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে সন্তানদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন তিনি।
দীর্ঘ সেই পথচলার এক পর্যায়ে এসে ছোট ছেলে মিজানুল ইসলামের সাফল্যে নতুন আনন্দের উপলক্ষ তৈরি হয়েছে পরিবারটিতে। ৪৫তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য গেজেটভুক্ত হয়েছেন তিনি। তাঁর এই অর্জনে আনন্দিত স্বজন ও এলাকার মানুষ।
মিজানুল ইসলাম চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে মেকাট্রনিক্স বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। পরে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সুযোগ পেলেও তাঁর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়া।
সেই স্বপ্ন পূরণে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মিজান। একটি প্রতিষ্ঠিত পেশা ছেড়ে অনিশ্চিত প্রতিযোগিতার পথে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। তবু নিজের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন তিনি।
প্রথম প্রচেষ্টায় সফলতা আসেনি। তবে ব্যর্থতাকে শেষ বলে মেনে নেননি। নতুন করে প্রস্তুতি নিয়ে আবারও চেষ্টা করেন। অবশেষে ৪৫তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য গেজেটভুক্ত হন।
মিজানুল ইসলামের এই যাত্রা তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার। কারণ, তাঁর গল্পে রয়েছে লক্ষ্য স্থির রাখা, প্রতিকূলতার মধ্যেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং ব্যর্থতার পর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর শিক্ষা।
বড় ছেলে নজরুল ইসলাম টিটু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি রূপালী ব্যাংক পিএলসির প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত।
বড় মেয়ে সোলতানা জাহান নিপা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে নিজের সন্তানদের সময় দিতে শিক্ষকতা থেকে বিরতি নিয়েছেন।
ছোট মেয়ে ডা. ইসরাত জাহান সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে ৪২তম বিসিএসের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত। পাশাপাশি শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে এমডি রেসিডেন্সি করছেন এবং এমআরসিপিসিএইচের তৃতীয় অংশ সম্পন্ন করেছেন।
আর সবার ছোট মিজানুল ইসলাম এখন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য গেজেটভুক্ত।
চার সন্তানের এই অর্জন তাঁদের নিজস্ব মেধা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের প্রতিফলন। একই সঙ্গে তাঁদের বেড়ে ওঠার পেছনে মায়ের দীর্ঘ সংগ্রাম ও দায়িত্ববোধের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
একজন মানুষের সাফল্যের খবর সামনে এলেও সেই সাফল্যের পেছনের সংগ্রাম অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। চাকরি পাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগে কতটা অনিশ্চয়তা, ব্যর্থতা ও অপেক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা সবার জানা হয় না।
মিজানুল ইসলামের জীবনেও রয়েছে এমন এক অধ্যায়। মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারানো, উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং পরে নিজের স্বপ্ন পূরণে চাকরি ছেড়ে বিসিএসের প্রস্তুতি—প্রতিটি ধাপই তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
অন্যদিকে, স্বামীকে হারিয়ে চার সন্তানকে নিয়ে পথচলা শুরু করা নুরজাহান বেগমের জীবনও এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা ধরে রেখে তাঁদের বেড়ে ওঠার পথকে এগিয়ে নিতে চেষ্টা করেছেন তিনি।
মিজানুল ইসলামের সাফল্যে তাই পরিবারের আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে আবেগের অনুষঙ্গ। তাঁর বাবা বেঁচে থাকলে সন্তানের এই অর্জনে নিশ্চয়ই আনন্দিত হতেন। বাবার অনুপস্থিতির সেই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়, তবে সন্তানের অর্জন পরিবারের জন্য বয়ে এনেছে গর্বের মুহূর্ত।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ