বুধবার ● ৭ অক্টোবর ২০২৬
   
শিরোনাম:
● দেড় হাজার কোটি টাকার জমি ২১ বছর ‘সংঘবদ্ধ চক্রের’ দখলে      ● বাংলাদেশ সফরে আসছেন জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফরিদা শহীদ      ● ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা থমকে গেছে, বন্ধ হয়নি ইসরায়েলি হামলা      ● অক্টোবরে ৫ দিনে রেমিট্যান্স এলো ৫১৩ মিলিয়ন ডলার      ● রাশিয়ার উপকূলে ড্রোন হামলায় তেলবাহী জাহাজে আগুন      ● যক্ষ্মা শনাক্তে জাপানের ১ লাখ ৪৫ হাজার ডলার অনুদান      ● শেষ মৌসুমেও ইলিশের দেখা নেই, জেলেদের ঘাড়ে ঋণের বোঝা      ● বিজিবির বাধায় সীমান্ত থেকে ফিরে গেল ৭ ভারতীয়      ● ৭ অক্টোবর: ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ২ লাখ ৩০ হাজার ৭৭২ টাকা      ● ভালুকায় নারী শ্রমিককে দলবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ২      ● শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ      ● মেসির বিদায়ী বক্তব্যে আবেগ, কাঁদলেন সবাই      
দেড় হাজার কোটি টাকার জমি ২১ বছর ‘সংঘবদ্ধ চক্রের’ দখলে
স্বদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১৩ পিএম

রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় মূল সড়কঘেঁষা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ১১ একর জমি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি ‘সংঘবদ্ধ চক্রের’ দখলে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।

রাজউকের নিজস্ব সম্পত্তি হলেও দীর্ঘ ২১ বছর ধরে জমিটি উদ্ধারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। জমি নিয়ে পাঁচটি রিট মামলা হলেও দীর্ঘ সময়েও সেগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি। এ সুযোগে সেখানে মাছ, মুরগি ও বাঁশের বড় বড় আড়ত গড়ে উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে জমি উদ্ধারের তৎপরতা থমকে আছে। ফলে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের জমিটি এখনো বেদখলে রয়েছে।

নথি ঘেঁটে জানা গেছে, ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩-এর ৯৩-এ ধারায় ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জমিটি অধিগ্রহণ করা হয়। তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাড্ডা মৌজায় সিএস দাগে ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। পরে ঢাকা জেলা প্রশাসনের এলএ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২-এর আদেশের মাধ্যমে ১৯৬২ সালের ২৫ এপ্রিল জমিটি ডিআইটির কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

ডিআইটির অনুকূলে জমিটির ‘দখল হস্তান্তর সনদ’ও দেওয়া হয়। ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিআইটির নাম পরিবর্তন করে রাজউক রাখা হয়।

জানা গেছে, জমিটি দখলে রাখতে ২০০৫ সালে দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারী নামে এক ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট করেন। একই বছর জমিটি দখলমুক্ত করতে রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলা উচ্ছেদ অভিযান চালান। এতে সংক্ষুব্ধরা উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আরেকটি রিট করেন।

এরপর ২০০৭ সালে মেরুল কাঁচাবাজার সমিতিও রিট করে। এভাবে জমিটি নিয়ে ধাপে ধাপে রাজউকের বিরুদ্ধে পাঁচটি রিট মামলা হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রামপুরা ব্রিজ থেকে কিছুটা দূরে মূল সড়কঘেঁষে রয়েছে বাঁশের আড়ত। এরপর রয়েছে মেরুল কাঁচাবাজার। সেখানে একটি ছোট টিনের ঘরে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি ও মেরুল সোনার বাংলা মৎস্য আড়তের’ কার্যালয় রয়েছে। আড়তের পাশে গড়ে উঠেছে বিশাল বস্তি। ১১ একর জমির পাশেই রয়েছে ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও মেরুল বায়তুল জামে মসজিদ।

রাজউক জমিটির মালিকানা দাবি করলেও সরেজমিনে সেখানে ব্যক্তিমালিকানার দাবি করে একটি সাইনবোর্ড টাঙানো দেখা গেছে। সাইনবোর্ডে জমির আমমোক্তার হিসেবে মোহাম্মদ শরীফ ভূইয়া ও বাবু চন্দ্র দাসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে জমির দাগ হিসেবে সিএস ও এসএ-১২৪৩, আরএস-৩০৩৯ এবং সিটি-১৫০০৯ দেওয়া হয়েছে। মোট জমির পরিমাণ ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।

মেরুল বাড্ডার ১১ একর জমি উদ্ধার ও রিট মামলা নিয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডে হতাশা প্রকাশ করেছেন রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘রাজউকের বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য রিট মামলা রয়েছে। মামলা চালানোর জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। রাজউকের বহু কর্মকর্তা আছেন, যারা কাজ করতে চান না। কারণ, তারা কাজ না করলেই তাদের লাভ। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না।’

এদিকে রাজউকের এই জমিকে ঘিরে আরেকটি চক্র সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জমিটির ওপর ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’র নামে ১ একর ৮৯ শতাংশ জমি বরাদ্দের একটি সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে।

১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই সমিতিতে ধাপে ধাপে প্রায় ৬ হাজার সদস্য যুক্ত হন। স্থায়ী দোকান পাওয়ার আশায় সদস্যরা তাদের সঞ্চয়ের টাকা সমিতিতে জমা দেন। বিভিন্ন সময় রসিদ ও নানা অজুহাতে তাদের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

এক মুদি দোকানি জানান, জমিটির মালিকানা নিয়ে আইনি অস্পষ্টতা ও জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’ গঠন করে। সেখানে আধুনিক কাঁচাবাজার ও মার্কেট নির্মাণ করে স্বল্পমূল্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকান দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সমিতির সদস্যরা দোকান পাননি।

২০১০ সালের ৮ মার্চ সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ কে এম মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনির ও অর্থ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ এক নোটিশে মামলা খরচ ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্য সদস্যদের এককালীন এক হাজার টাকা দেওয়ার কথা জানান। একই নোটিশে মৃত বা অন্যত্র চলে যাওয়া সদস্যদের সদস্যপদ উত্তরাধিকারী কিংবা অন্যের নামে হস্তান্তরের সুযোগ দিয়ে এর জন্য দুই হাজার টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়।

এভাবে বিভিন্ন সময়ে নোটিশ দিয়ে সদস্যদের কাছ থেকে বছরের পর বছর টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০০৫ সালের দিকে বিতর্কিত জমিতে রাজউক উচ্ছেদ অভিযান চালালে সমিতির কার্যক্রমও থমকে যায়। সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেন। পরে সমিতির কার্যালয় মেরুল বাড্ডা থেকে মতিঝিলে সরিয়ে নেওয়া হয়। রাজউকের আইনি জটিলতা কেটে যাবে—এমন আশ্বাস দিয়ে রসিদের মাধ্যমে আবারও চাঁদা ও কিস্তির টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজউকের চোখের সামনে একটি সমিতি বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নিয়েছে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে আইনি প্রতিকার ও অর্থ ফেরতের আশায় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছেন।

তাদের দাবি, কথিত ‘দোকানদার সমিতি’র নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার হিসাব উদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্ত সদস্য ও তাদের উত্তরসূরিদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে।

মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মেরুল বাড্ডার মতো এলাকায় নিজের একটা দোকান হবে, সেই আশায় সমিতির সদস্য হয়েছি। মাসে মাসে টাকা পরিশোধ করেছি। দীর্ঘ ১৬ বছরেও দোকান মেলেনি। উল্টো সমিতিতে সদস্যদের টাকা লুট হয়েছে। সমিতির পাঁচ হাজার সদস্যের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা উধাও।’

আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) বলেন, ‘একটি দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়ে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য হয়েছি। দীর্ঘ ২০ বছরে সমিতিতে প্রায় ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। দোকান পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, এজন্য সমিতিতে কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তবে, আমার জমানো টাকার হদিস নেই সমিতিতে।’

সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন বলেন, ‘১৯৮৮ সালে যাত্রা হওয়া এই সমিতিতে সদস্যরা টানা ৩০ বছর ধরে চাঁদা দিয়েছেন। কিন্তু তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। গত ১০ বছর সমিতির সমস্ত কার্যক্রম সম্পূর্ণ থমকে আছে। এর পেছনে মূল কারণ—আমাদের সমিতিতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকা লুটপাট।’

তিনি আরও বলেন, ‘সমিতির সাইনবোর্ড দেওয়া জমি রাজউকের। রাজউকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পরও ‘শংকর’ নামের একপক্ষ জমির দাবি তুলে মামলা ঝুলিয়ে রেখেছে।’





স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি


আরও সংবাদ   বিষয়:  রাজউক   মেরুল বাড্ডা   জমি দখল   মেরুল কাঁচাবাজার   রাজউকের জমি   জমি দখলচক্র   প্রতারণা   ৩০০ কোটি টাকা   রাজধানী   বাড্ডা  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close