
বরেন্দ্র অঞ্চলের জলবায়ু সংকটকে জাতীয় ও বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনার অগ্রাধিকারে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। ‘খরা থেকে ন্যায়বিচারের পথে: বরেন্দ্র থেকে বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন’ আহ্বানে বৃহস্পতিবার রাজশাহীতে বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়েছে। পানি, খাদ্য, তাপ, প্রকৃতি, জীবিকা ও জলবায়ু ন্যায়বিচারকে কেন্দ্র করে কর্মসূচিতে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়।
সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে এ কর্মসূচির আয়োজন করে বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম, গ্রিন কোয়ালিশন ও উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক। এতে কৃষক-কিষাণী, নারী, যুব, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, পরিবেশকর্মী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, বরেন্দ্রের দীর্ঘস্থায়ী খরা, তাপপ্রবাহ, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বাড়তে থাকা চাপ, কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার ঝুঁকি, নদী-খাল-পুকুর ও জলাভূমির সংকট, প্রাণবৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং জীবিকার ঝুঁকি পরস্পর সম্পর্কিত। এসব সংকট মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জলবায়ু অভিযোজন কাঠামো প্রয়োজন। একই সঙ্গে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গ্রিন কোয়ালিশন বরেন্দ্র অঞ্চলের সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলে একসময় প্রচুর পুকুর, ছোট নদী, খাল-খাড়ি ছিল, এগুলো নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। এই অঞ্চলের পানি সংকটকে আরও জটিল করছে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন। কিন্তু পানি পুনর্ভরণ ঠিকমতো না হওয়ায় সংকটগুলো দ্রুত তীব্র হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল থেকে এই অঞ্চলের জন্য পৃথক তহবিল গঠন করে সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’
নৃবিজ্ঞানী ও বারসিকের বরেন্দ্র অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু সংকটের প্রভাব উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত। বরেন্দ্রে এর বাস্তব চিত্র খরা, পানি সংকট ও কৃষকের জীবিকায় স্পষ্ট। তাই জলবায়ু ন্যায়বিচারের পাশাপাশি পানি, খাদ্য ও জীবিকার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, ‘বরেন্দ্রের খরা, পানি সংকট, তাপপ্রবাহ ও জীবিকার ঝুঁকি কোনো বিচ্ছিন্ন স্থানীয় সমস্যা নয়। এগুলো জলবায়ু অভিযোজন ও ন্যায়বিচারের বৈশ্বিক আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই বরেন্দ্রের বাস্তবতাকে কপ-৩১-এর জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন ও লস অ্যান্ড ড্যামেজ আলোচনায় কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’
রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জুয়েল কিবরিয়া বলেন, ‘প্রকৃতি কখনো ছেড়ে দেয় না, প্রকৃতি এর প্রতিশোধ নেবেই। নেপালে যে বিপর্যয় হয়েছে, সেটির জন্য নেপাল দায়ী নয়। দায়ী সেই ধনী দেশগুলো, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী। কিন্তু এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে নেপালকে। বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। অবিলম্বে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় পদক্ষেপ না নিলে সংকট আরও কঠিন হবে।’
নগর প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি নিলুফার ইসমত আরা বলেন, ‘রাজশাহীতে যতগুলো বস্তি আছে, সেখানে যারা বসবাস করেন, তাদের বেশিরভাগই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নদীভাঙনের শিকার হয়ে এসেছেন। তারা নানাভাবে বৈষম্যের শিকার। তাদের পানির অধিকার, বসবাসসহ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’
আদিবাসী যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাবিত্রী হেমব্রম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আমরা দায়ী না হয়েও এর ফল ভোগ করছি। আমরা জলবায়ু ন্যায্যতা চাই।’
আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনের উদ্দেশে বরেন্দ্র থেকে পাঁচটি মূল বার্তা তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলকে জলবায়ু সম্মুখসারি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, পানি নিরাপত্তাকে জলবায়ু নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার করা, জলবায়ু সহনশীল খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি ও অভিযোজনের জন্য ন্যায়সংগত অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
কর্মসূচিতে আতিকুর রহমান ‘বরেন্দ্র জলবায়ু ন্যায্যতার ১২ দফা’ দাবি উপস্থাপন করেন। এতে পানি, কৃষি, স্বাস্থ্য, জীবিকা, প্রকৃতি ও সামাজিক সুরক্ষাকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি ‘বরেন্দ্র জলবায়ু সহনশীলতা কাঠামো’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ, ভূ-উপরিস্থ পানির অগ্রাধিকার এবং নদী, খাল, পুকুর, বিল, জলাভূমি, বন ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের পথ দখল, ভরাট ও দূষণমুক্ত করে পুনরুদ্ধারের দাবি জানানো হয়।
দাবির মধ্যে রয়েছে জলবায়ু-সহনশীল ও পানি-সাশ্রয়ী কৃষি, মাটির স্বাস্থ্য ও কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষা, স্থানীয় কৃষিজ্ঞানকে নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, ব্যবহার ও বিনিময়ে কৃষকের অধিকার ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা। বরেন্দ্রের খরা মোকাবিলায় পৃথক দীর্ঘমেয়াদি খরা তহবিল, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খরা ভাতা ও পুনর্বাসন সহায়তা চালুর দাবিও করা হয়।
এ ছাড়া কৃষক, কৃষিশ্রমিক, নারী ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য ন্যায্য মূল্য, অভিযোজন সহায়তা, জীবিকা ও সামাজিক সুরক্ষা, তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা, শ্রমিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতি এবং তাপ-সহনশীল জনপরিসর ও অবকাঠামো নিশ্চিত করার দাবি তোলা হয়।
ন্যায়ভিত্তিক স্থানীয় জলবায়ু অর্থায়নের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে সরাসরি, পর্যাপ্ত, স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক অর্থায়ন পৌঁছানোর দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি শনাক্ত, নথিভুক্ত ও মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনরুদ্ধার সহায়তার কথাও বলা হয়।
সবশেষে কৃষক, নারী, যুব ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক জলবায়ু শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি, অভিযোজন পরিকল্পনা ও অর্থায়নে বরেন্দ্রের খরা, পানি সংকট ও তাপপ্রবাহজনিত ঝুঁকিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
জলবায়ু ধর্মঘটে আরও বক্তব্য রাখেন গ্রিন কোয়ালিশন রাজশাহী মহানগরের সভাপতি মাহমুদ জামাল কাদেরী, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক পলি রানী, প্রচার-প্রকাশনা সম্পাদক হাসিবুল হাসনাত রিজভি, প্রজেক্ট আর্থকেয়ারের নির্বাহী সমন্বয়ক আর-রাফী সিরাজী অন্তর, আদিবাসী নেতা উপেন রবিদাস ও ছোট্ট স্বপ্ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. রকি আলী।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি