বৃহস্পতিবার ● ১ অক্টোবর ২০২৬
   
শিরোনাম:
● গতির বাজারে পিছিয়ে প্রগতি      ● চুয়াডাঙ্গায় পুলিশের ওপর হামলা, হ্যান্ডকাপ পরা আ.লীগ নেতাকে ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ      ● পাকিস্তানের বিমান হামলায় আফগানিস্তানে নিহত ২২      ● হামলা হলে কঠোর জবাব দেবে সৌদি: যুবরাজ সালমান      ● বিষখালী নদীতে নিখোঁজ হওয়ার দুদিন পর জেলের লাশ উদ্ধার      ● চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ককটেল বিস্ফোরণ      ● ফেনীর পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান      ● বিকল্প রুটে স্বাভাবিক হলো উপসাগরীয় তেল রপ্তানি      ● ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ পেলেন ৬১১ জন      ● এলাকার উন্নয়নে ২৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ এনেছি      ● জাতিসংঘে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার বার্তা: মাহদী আমিন      ● নজরুল বর্ষ ও কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা      
গতির বাজারে পিছিয়ে প্রগতি
স্বদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৫ AM

দেশের একমাত্র সরকারি গাড়ি সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি যন্ত্রাংশনির্ভর অ্যাসেম্বলি ব্যবসায় আটকে আছে। পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও নিজস্ব গাড়ি বা যন্ত্রাংশ উৎপাদনে যেতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে সরকারি গাড়ি কেনায় কৃচ্ছ্রসাধন নীতি এবং ইলেকট্রিক গাড়ির দিকে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে প্রগতির ব্যবসায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে মাত্র ২৬৯টি যানবাহন বিক্রি করেছে প্রগতি। গাড়ি ও অন্যান্য পণ্য মিলিয়ে বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ২৪৮ কোটি ২১ লাখ টাকা, যেখানে আগের বছর আয় ছিল ৪৩২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে বিক্রি কমেছে প্রায় ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ৫৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা থেকে কমে ৩৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় নেমেছে।

প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা এক হাজারের বেশি গাড়ি। অতীতে প্রতিষ্ঠানটি বছরে ৮০০ থেকে ৯০০ গাড়ি বিক্রি করলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৪৮টি গাড়ি বিক্রির রেকর্ড গড়ে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে এক হাজার গাড়ি উৎপাদন ও বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সার্বিক পরিস্থিতিতে এর ১০ শতাংশও পূরণ করা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

প্রতিষ্ঠানটির মূল ক্রেতা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারি প্রকল্প। তবে সরকারি গাড়ি কেনায় ব্যয়সংকোচন এবং ইলেকট্রিক গাড়িকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতির কারণে প্রগতির প্রচলিত ব্যবসা চাপে পড়েছে। গত ৮ জুলাই অর্থ বিভাগের এক পরিপত্রে নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যানবাহন কেনার বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় বন্ধ রাখার কথা বলা হয়। নতুন বা প্রতিস্থাপন করা জিপ-কারের ক্ষেত্রে ইলেকট্রিক গাড়িকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিও রয়েছে।

অন্যদিকে, উন্মুক্ত বাজারেও বিদেশি ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে প্রগতি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে জিপ, পিকআপ, বাস ও অ্যাম্বুলেন্স মিলিয়ে ৬৬ হাজার ৬২৯টি যানবাহন নিবন্ধিত হয়েছে। এর বিপরীতে একই সময়ে প্রগতি বিক্রি করেছে ১ হাজার ৭০৭টি গাড়ি। হিসাবে বাজারে প্রতিষ্ঠানটির অংশ প্রায় ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত শোরুম ও কারখানায় ১৫৩টি তৈরি গাড়ি অবিক্রীত অবস্থায় ছিল। এসব গাড়ির মোট বাজার বা উৎপাদনমূল্য ১৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। মজুত গাড়ির মধ্যে ১০৬টি পাজেরো জিপ, ২৫টি কিয়া সেডান ও ১৪টি মাহিন্দ্রা পিকআপসহ বিভিন্ন মডেলের গাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া ৭ কোটি ২৯ লাখ টাকার কাঁচামালও মজুত ছিল, যার বড় অংশ পাজেরো জিপের যন্ত্রাংশ।

প্রগতি ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামের বাড়বকুণ্ডে ইংল্যান্ডের জেনারেল মোটরসের সহযোগিতায় ‘গান্ধারা ইন্ডাস্ট্রিজ’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৯৭২ সালে জাতীয়করণের পর প্রতিষ্ঠানটি প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) অধীনে আসে। জাপান, ভারত, চীন ও কোরিয়া থেকে যন্ত্রাংশ এনে জিপ, পিকআপ, বাস, মিনিবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও সেডানসহ বিভিন্ন যানবাহন সংযোজন ও বাজারজাত করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০২০ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৫০ একর জমিতে গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। জাপানের মিৎসুবিশি, টয়োটা, সুজুকি ও ইসুজুর কারিগরি সহযোগিতায় ওই কারখানা করার পাশাপাশি প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে প্রগতি সংযোজিত গাড়ি রপ্তানির পরিকল্পনাও ছিল। তবে ছয় বছর পরও সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।

ঢাকার তেজগাঁওয়ে নিজস্ব সার্ভিস সেন্টার ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ প্রতিষ্ঠানের গাড়ি বিক্রির ৯৬ শতাংশের বেশি ঢাকায়। নতুন করে তেজগাঁওয়ে ওয়ার্কশপ তৈরি করা হলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অভাবে সেটি চালু করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।

তবে গাড়ি বিক্রি কমলেও ব্যাংক আমানত থেকে পাওয়া আয় প্রতিষ্ঠানটির মুনাফাকে কিছুটা ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালে গাড়ি সংযোজন ও বিক্রি থেকে পরিচালন মুনাফা হয়েছে মাত্র ৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা। একই সময়ে সোনালী, জনতা ও বেসিক ব্যাংকে থাকা এফডিআরসহ বিভিন্ন ব্যাংক আমানত থেকে ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আয় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে মূল ব্যবসার দুর্বলতা সত্ত্বেও অ-পরিচালন আয় নিট মুনাফা ধরে রাখতে ভূমিকা রেখেছে।

২০২৫ সালে প্রগতির নিট বিক্রয়ের বাজেট ছিল ৬৬০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। বিপরীতে প্রকৃত বিক্রি হয়েছে ২৪৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬২ দশমিক ৪৪ শতাংশ কম বিক্রি হয়েছে। কর-পরবর্তী নিট মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা, কিন্তু অর্জন হয়েছে ৩৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫৬ দশমিক ১১ শতাংশ কম।

প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাঈম বলেন, ‘প্রগতির মূলগ্রাহক সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সরকারি সিদ্ধান্তে সব ধরনের যানবাহন ক্রয় খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় বন্ধ রয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, আগামীতে গাড়ি প্রতিস্থাপন বা নতুন ক্রয়কৃত মোটরযান অবশ্যই ইলেকট্রিক গাড়ি হতে হবে। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বিআরটিসি ইলেকট্রিক ৫০টি যাত্রীবাহী শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের অর্ডার দিয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর ইলেকট্রিক বাসের কার্যক্রম উদ্বোধন হবে।’

তেজগাঁওয়ে মিৎসুবিশির অনুমোদিত ওয়ার্কশপ বা সার্ভিস সেন্টার তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, সেখানে মিৎসুবিশির পরিচালনায় গাড়ির যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হবে এবং ঢাকায় বসেই গ্রাহকেরা জাপানি সেবা পাবেন।

প্রগতি কেন এত বছরেও নিজস্ব যন্ত্রাংশ উৎপাদনে যেতে পারেনি—এ বিষয়ে আবু সাঈম বলেন, ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, নতুন পরিকল্পনা নেওয়ার আগেই ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় নিজস্ব যন্ত্রাংশ তৈরির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, সরকারি কেনাকাটা বন্ধ হয়নি। তবে সরকারের নীতি অনুযায়ী ইলেকট্রিক গাড়ি কেনার দিকে ঝোঁক রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য গাড়িও কেনা হচ্ছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক প্রগতির দীর্ঘদিনের কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি এবং জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সরকারের সরাসরি ব্যবসায় যুক্ত থাকার বদলে মুক্ত বাজারে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিবেশ তৈরি করা উচিত। সরকারের মূল কাজ হওয়া উচিত সঠিক নীতিনির্ধারণ এবং বাজার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করা।’

প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের আর্থিক ভিত্তি অবশ্য এখনো বড়। অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ইক্যুইটি ও অন্যান্য সঞ্চিতির পরিমাণ ৮৫৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং মোট সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার ৫২৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। তবে গাড়ি বিক্রির মূল ব্যবসা দুর্বল হয়ে পড়লে ব্যাংক আমানত থেকে পাওয়া আয়ের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক সক্ষমতার প্রশ্নকে আরও সামনে আনছে।






স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ   গাড়ি   সরকারি গাড়ি   গাড়ির বাজার   বিএসইসি   ইলেকট্রিক গাড়ি   গাড়ি বিক্রি   প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের লোকসান   বাংলাদেশ গাড়ির বাজার   মিৎসুবিশি  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close