
কক্সবাজার শহরের পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকা কলাতলী। সড়কের এক পাশে সারি সারি দোকান ও পরিবহন কাউন্টার। অন্য পাশে টিনের উঁচু বেড়া। বেড়ার আড়ালে চলছে নতুন স্থাপনা নির্মাণের কাজ। কোথাও কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে, কোথাও চলছে ছাদ ও দেয়ালের কাজ। শ্রমিকদের ব্যস্ততা দেখে বোঝার উপায় নেই, জায়গাটি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে এবং সেখানে নতুন স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সরেজমিনে কলাতলী পুলিশ বক্স থেকে ওসান প্যারাডাইস পর্যন্ত সড়কের পাশে এমন চিত্র দেখা যায়। প্রায় ১৫ ফুট উঁচু টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গাটির ভেতরে অন্তত ১৯টি দোকান নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে ১০টির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। নির্মাণকাজে ব্যস্ত ছিলেন আটজন শ্রমিক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি খাসজমিতে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণাধীন দোকানগুলো মোটা অঙ্কের ‘সালামি’র বিনিময়ে বরাদ্দ দেওয়ার কথাও এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, প্রতিটি দোকানের জন্য ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত এককালীন সালামি এবং মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, টিনের বেড়ার মাঝখানে পরপর তিনটি সাইনবোর্ড টাঙানো। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বিএস খতিয়ান নম্বর-০১-এর ৩০ নম্বর প্লট, যার দাগ নম্বর ২০০০৩, নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন। ওই জায়গায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নতুন কোনো স্থাপনা না তোলার বিষয়ে উচ্চ আদালতের ‘স্থিতাবস্থা’ আদেশ রয়েছে বলেও সাইনবোর্ডে উল্লেখ করা হয়েছে।
জায়গাটির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণকাজে নিয়োজিত আটজন শ্রমিক ব্যস্ত। তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, একজন ‘মাঝি’র সঙ্গে চুক্তিতে তারা নির্মাণকাজ করছেন। ওই ব্যক্তির মুঠোফোন নম্বর জানতে চাইলে শ্রমিকেরা বলেন, সন্ধ্যার পর এলে তাকে পাওয়া যাবে। এ সময় ইউনিফর্ম পরা রাকিব নামের এক নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, সিকিউরিটি ইনচার্জ মান্নানের মাধ্যমে তিনি সেখানে চাকরি করছেন।
পুরো জায়গার দায়িত্ব কী তার ওপর—এমন প্রশ্নের জবাবে রাকিব বলেন, ‘এই পুরো এলাকার দেখাশোনা আমি করি।’
তবে এসব স্থাপনা কে নির্মাণ করছেন, কার নির্দেশে কাজ চলছে বা জমিটির মালিকানা কার—এসব বিষয়ে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
নির্মাণাধীন অংশের পাশেই সরকারি জায়গায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু স্থাপনা গড়ে উঠেছে। সরেজমিনে অন্তত ১১টি কাউন্টার ও ট্রাভেল এজেন্সি এবং তিনটি চায়ের দোকান দেখা যায়।
সেখানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈশাখী রেস্তোরাঁ, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ফরিদ ট্রাভেলস, বৈশাখী বাস কাউন্টার, স্কার ট্রাভেলস লিমিটেড, এসআই এন্টারপ্রাইজ, গ্রিন সেন্টমার্টিন এক্সপ্রেস, বেঙ্গল পরিবহন, আইকন পরিবহন ও স্বপ্ন তরী।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একই প্লটের একাংশে এর আগেও আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বৈশাখী রেস্তোরাঁসহ প্রায় ২০টি দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। এসব স্থাপনা থেকে একটি চক্র কোটি টাকার মতো এককালীন সালামি এবং নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে বলে অভিযোগ তাদের।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৮ মে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) কলাতলীর ডলফিন মোড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই অভিযানে বেশ কিছু দোকান ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও বৈশাখী রেস্তোরাঁ এবং এর আশপাশের কিছু স্থাপনায় অভিযান চালানো হয়নি। এ নিয়ে তখন থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে বলে জানান কয়েকজন বাসিন্দা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে ওই এলাকায় সরকারি জমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে।
তাদের দাবি, নতুন করে নির্মাণাধীন দোকানগুলোও আগাম টাকা নিয়ে বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রসাদ প্যারাডাইসের মালিক ইউসুফ আবদুল্লাহর নামে বরাদ্দ দেওয়া ৩০ নম্বর প্লটটি পরে সরকার বাতিল করে। এরপর জমিটি সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সরকারি জমি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরও সেখানে কীভাবে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণ হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা।
তাদের মতে, কক্সবাজারের প্রধান পর্যটন এলাকায় এমন সরকারি জমি দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আসার পর সোমবারই সরেজমিনে খোঁজ নিতে কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়। কক্সবাজার সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মশিয়ুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পারার পর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সোমবার সন্ধ্যায় লোক পাঠানো হয়েছে। আদালতের আদেশের সুযোগ নিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে সরকারি খাসজমি দখল করার কোনো সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘বাতিলকৃত সরকারি প্লটে অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণের কাজ চললে সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত নির্মাণকাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, ‘বাতিলকৃত প্লটে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি জানার পর সহকারী কমিশনারকে বলা হয়েছে। বাতিলকৃত প্লটে কোনো অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বেআইনি। এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, আদালতের স্থিতাবস্থা আদেশের মধ্যে সরকারি জমিতে নতুন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগটি দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি জমির মালিকানা ও বরাদ্দের নথি যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ