
কুমিল্লায় আলোচিত ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন তাঁর মা-বাবা। তাঁদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অপ্রতিমের মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের আশঙ্কা, তাঁর ও তাঁর স্বামীর ওপরও হামলা হতে পারে।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) যুগান্তরকে দেওয়া বক্তব্যে নাহিদা বেগম বলেন, যারা অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে, তারা ভবিষ্যতে ভুক্তভোগী পরিবারের অন্য সদস্যদেরও টার্গেট করতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা কিশোর সংশোধনাগার থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে আবারও অপরাধে জড়াতে পারে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দ্যা এলাকায় অপ্রতিমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারকে অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।
ফিরোজ শাহরিয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে গ্রামীণফোনের একটি নম্বর থেকে হুমকি দেওয়া হয়। পরে নম্বরটি বন্ধ করে দেওয়া হলে এয়ারটেলের আরেকটি নম্বর থেকে একাধিকবার ফোন আসে। পরবর্তী সময়ে নম্বর দুটিতে কল করলে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। ট্রু কলারে নম্বরগুলো যথাক্রমে ‘রাসেল স্টোর’ ও ‘মোহাম্মদ আলি’ নামে সংরক্ষিত দেখা গেছে বলে জানান তিনি।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ খতিয়ে দেখতে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তদন্তে তাঁর মা নাহিদা বেগমের মাদকবিরোধী অবস্থানের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
নাহিদা বেগম বলেন, তিনি স্থানীয় কোটবাড়ী-সালমানপুরের মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। এ কারণে তাঁর পরিবারকে টার্গেট করা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। তাঁর আরও আশঙ্কা, হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা বয়সের কারণে আইনের কোনো সুযোগ নিয়ে বেরিয়ে এলে ভবিষ্যতে আবারও সহিংসতায় জড়াতে পারে।
ছেলের বেড়ে ওঠার কথা স্মরণ করে নাহিদা বেগম বলেন, তিনি অপ্রতিমকে প্রচলিত ধারণার চিকিৎসক বা প্রকৌশলী বানানোর পরিকল্পনা করেননি। বরং চেয়েছিলেন, ছেলে দেশ-বিদেশ ঘুরে নিজের মতো করে বিশ্বকে উপলব্ধি করুক এবং নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে শিখুক।
তিনি জানান, অপ্রতিমকে ফটোগ্রাফি, সাইক্লিং ও সাঁতার শেখানো হয়েছিল। কারাতের প্রশিক্ষণও নিয়েছিল সে। এক বছর নাচও শিখেছিল। তার ব্যবহৃত হারমোনিয়াম এখনো ঘরে রয়েছে বলে জানান তিনি।
নাহিদা বেগম বলেন, তিনি চেয়েছিলেন তাঁর ছেলে প্রতিটি কাজে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠুক। অপ্রতিম খুব দ্রুত মানুষকে আপন করে নিতে পারত এবং বয়সের ব্যবধান কিংবা সিনিয়র-জুনিয়র বিবেচনা করত না। সন্তান প্রতিপালনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমার ভুল হতে পারে।’ একই সঙ্গে অভিভাবকদের সন্তানকে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের চলাফেরা, বন্ধুত্ব ও কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
অপ্রতিমের বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদেরও শঙ্কা কাজ করে। মাঝেমধ্যে কিছু নম্বর থেকে কল আসে, কিন্তু পরিচয় দেয় না। সেদিন কল করে গালিগালাজ করেছে।’
নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পাশাপাশি বিষয়টি গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) জানানোর কথা বলেন তিনি।
সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিটি আশঙ্কা তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। তদন্তে অনেক অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। শুরুতে মামলাটি তদন্ত করছিলেন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার এসআই সাইফুল ইসলাম। শুক্রবার তিনি জানান, এখন থেকে মামলাটি তদন্ত করবেন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজিব আহমেদ।
নতুন তদন্ত কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ বলেন, পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের আদেশ হয়েছে। মামলার নথি পাওয়ার পর তিনি তদন্তের কাজ শুরু করবেন। দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি