
পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সাজাতে চায় নেপালের বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন সরকার। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে জানিয়েছেন, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিমান চলাচল, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের আমন্ত্রণে তিন দিনের ভারত সফর শেষে শনিবার কাঠমান্ডু ফিরে এসব কথা বলেন ওয়াগলে। ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু-এর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নেপাল-ভারত সম্পর্কের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরেন।
ওয়াগলে বলেন, নেপালি জাতীয়তাবাদকে ভারতবিরোধিতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার পুরোনো রাজনৈতিক ধারা এখন শেষ হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ভারতবিরোধী মনোভাবের রাজনীতি থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক সুযোগ, যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণ, ভারতের সরবরাহশৃঙ্খলে নেপালের অংশগ্রহণ এবং দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তি আধুনিকায়নে গুরুত্ব দিতে চায় সরকার।
তবে দীর্ঘদিনের সীমান্তবিরোধসহ স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নেপাল এড়িয়ে যাবে না বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। এসব বিষয়ে কূটনৈতিক ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।
চলতি বছরই ভারত সফর করতে পারেন বালেন্দ্র শাহ
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও কথা বলেছেন ওয়াগলে। তিনি জানান, শাহের প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর হিসেবে ভারত সফরের সম্ভাবনা রয়েছে এবং ২০২৬ সালের শেষ হওয়ার আগেই তা হতে পারে।
নেপালের নতুন সরকারের জন্য সম্ভাব্য এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও ভারতের উদ্বেগ
চীনের সঙ্গে নেপালের বাড়তে থাকা সম্পর্ক নিয়ে ভারতের কিছু উদ্বেগ রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন ওয়াগলে। বিশেষ করে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে চীনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।
তবে তাঁর মতে, পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে নেপালকে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ এগিয়ে নিতে হবে। চীনের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভারত না কেনার বিষয়টিকেও তিনি বর্তমান আঞ্চলিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখছেন।
নেপালে চীনের প্রভাব নিয়ে প্রচলিত কিছু ধারণাকে অতিরঞ্জিত বলেও মন্তব্য করেন ওয়াগলে। তাঁর দাবি, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে চীনা ব্যাংকঋণের প্রবাহ থাকলেও নেপাল সে সময় বড় ধরনের চীনা ব্যাংকঋণ পায়নি।
পোখারা বিমানবন্দর নিয়েও আলোচনা
নেপালের পোখারা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীনের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, প্রকল্পটি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতাভুক্ত কি না, তা নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। কারণ, বিআরআই চালুর আগেই প্রকল্পটি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল।
ওয়াগলে জানান, পোখারা বিমানবন্দরসহ নেপালে চীনের মোট অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ২৬ কোটি ডলার।
তিনি বলেন, ভারত নেপালকে সব খাত থেকে চীনা কোম্পানিকে বাদ দেওয়ার কথা বলেনি। তবে যেসব প্রকল্প থেকে ভারত বিদ্যুৎ কিনবে, সেসব প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে দিল্লির বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে। ভারতের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ায় নেপালও ভবিষ্যৎ প্রকল্প পরিকল্পনায় বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারবে।
ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্যে জোর
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে যোগাযোগব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ওয়াগলে। নেপালের সঙ্গে ভারতের বিমান যোগাযোগ বাড়ানো, রেলপথ সম্প্রসারণ, সমন্বিত স্থলবন্দর উন্নয়ন এবং সীমান্তবর্তী শহরগুলোর সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
পাশাপাশি নেপাল-ভারত বাণিজ্য চুক্তি আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন অর্থমন্ত্রী। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের সঙ্গে বৈঠকেও তিনি বিষয়টি তুলেছেন বলে জানান।
নেপালের নতুন সরকারের বক্তব্যে অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগকে ভারত-নেপাল সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বর্ণিম ওয়াগলে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ