
নতুন মৌসুমের প্রথম ম্যানচেস্টার ডার্বিতে আজ মুখোমুখি হচ্ছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটি। প্রিমিয়ার লিগের বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ওল্ড ট্রাফোর্ডে। বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৯টায় শুরু হতে যাওয়া ম্যাচটিতে এখনই শিরোপার সমীকরণ জড়ানোর সুযোগ নেই। তবে দুই দলের সাম্প্রতিক অবস্থান ও পরিবর্তনের কারণে এই ম্যাচ থেকেই মৌসুমের সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
ডার্বির আগে তাই আলোচনায় রয়েছে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
গার্দিওলা-পরবর্তী সিটির আধিপত্য কি কমতে শুরু করবে?
একসময় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছিল ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী দল। কিন্তু গত এক যুগে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। টানা ১৩ মৌসুম সিটির নিচে থেকে লিগ শেষ করেছে ইউনাইটেড। সর্বশেষ ২০১২-১৩ মৌসুমে সিটির ওপরে থেকে লিগ শেষ করেছিল তারা—স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের শেষ মৌসুমে।
সিটির এই দীর্ঘ আধিপত্যের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন পেপ গার্দিওলা। এবার তিনি ক্লাব ছাড়ায় শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব নিয়েছেন এনজো মারেসকা। খেলোয়াড়দের মধ্যেও এসেছে পরিবর্তন। জন স্টোনস, রদ্রি ও বের্নার্দো সিলভার মতো গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলাররা এখন আর দলের সঙ্গে নেই।
তবু নতুন মৌসুমে সিটির শুরুটা হয়েছে দারুণ। লিগে তিন ম্যাচেই জয় পেয়েছে তারা। অন্যদিকে চ্যাম্পিয়নস লিগে ফেরা ইউনাইটেডও আগের চেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করছে। গত মৌসুমে সিটির পর তৃতীয় স্থানে থেকে লিগ শেষ করেছিল তারা, ব্যবধান ছিল সাত পয়েন্ট।
আজকের ডার্বি হয়তো মৌসুমের চূড়ান্ত চিত্র দেবে না, তবে গার্দিওলা-বিহীন সিটিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো অবস্থায় ইউনাইটেড পৌঁছেছে কি না, তার একটি আভাস দিতে পারে।
ক্যারিকের দ্রুত আক্রমণ নাকি মারেসকার নিয়ন্ত্রিত ফুটবল—কার কৌশল সফল হবে?
ডার্বির আরেকটি বড় আকর্ষণ হবে দুই কোচের ফুটবল দর্শনের লড়াই। মাইকেল ক্যারিকের ইউনাইটেড দ্রুত আক্রমণ ও কাউন্টার অ্যাটাকে বেশি বিপজ্জনক। বল দখলে আসার পর দ্রুত প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের পেছনের জায়গায় আক্রমণ করতে চায় তারা। ব্রুনো ফার্নান্দেজের পাস এবং মার্কাস রাশফোর্ড, ব্রায়ান এমবিউমা ও মাতেউস কুনিয়ার গতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
অন্যদিকে এনজো মারেসকার সিটি বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ম্যাচের গতি নির্ধারণ করতে চায়। নতুন কোচের অধীনে কিছু কৌশলগত পরিবর্তন এলেও বল দখল, চাপ সৃষ্টি এবং হাই প্রেসিংয়ের ওপর সিটির মূল নির্ভরতা অটুট রয়েছে।
তবে নতুন সিটিকে এখনো পুরোপুরি পরিণত দল মনে হচ্ছে না। মৌসুমের শুরুতে কয়েকটি ম্যাচে প্রতিপক্ষ মাঝমাঠ ভেদ করে দ্রুত আক্রমণে সিটির রক্ষণে জায়গা তৈরি করতে পেরেছে। ইউনাইটেডের গতিময় আক্রমণ তাই সিটির জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে।
অর্থাৎ আজকের ম্যাচে দেখা যাবে, ক্যারিকের দ্রুত ট্রানজিশন নাকি মারেসকার বল নিয়ন্ত্রণ ও প্রেসিং—কোন কৌশল শেষ পর্যন্ত বেশি কার্যকর হয়।
ওল্ড ট্রাফোর্ডের শক্তি কি সিটিকে থামাতে পারবে?
লিগে ইউনাইটেডের শুরুটা খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। প্রথম তিন ম্যাচে তাদের সংগ্রহ মাত্র চার পয়েন্ট। হালের বিপক্ষে হার এবং এভারটনের সঙ্গে ড্রয়ের কারণে শুরুতেই কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। তবে ঘরের মাঠে তাদের পারফরম্যান্স সম্পূর্ণ ভিন্ন।
২০২৬ সালে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ১০টি লিগ ম্যাচের নয়টিতেই জয় পেয়েছে ইউনাইটেড। এই সময়ে তারা করেছে ২৬ গোল। একমাত্র পরাজয় লিডসের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে।
ঘরের মাঠে ইউনাইটেডের সাফল্যের অন্যতম বড় কারণ ব্রুনো ফার্নান্দেজ। সর্বশেষ ১০ হোম লিগ ম্যাচে পর্তুগিজ মিডফিল্ডারের গোল পাঁচটি, অ্যাসিস্ট ১০টি। এমবিউমা ও কুনিয়া করেছেন চারটি করে গোল, আর বেঞ্জামিন শেশকোর নামের পাশে রয়েছে পাঁচ গোল।
তবে রক্ষণ নিয়ে চিন্তাও আছে। ওই ১০ ম্যাচে ১৩ গোল হজম করেছে ইউনাইটেড। সিটি তাই বল দখলে রেখে ইউনাইটেডের কাউন্টার অ্যাটাকের সুযোগ কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের রক্ষণকে ক্রমাগত চাপে রাখার চেষ্টা করতে পারে।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—ওল্ড ট্রাফোর্ডের ঘরের শক্তি নাকি সিটির দুর্দান্ত শুরুর আত্মবিশ্বাস, কোনটি আজ বেশি কার্যকর হবে?
মাঝমাঠের লড়াইয়ে মাইনু নাকি অ্যান্ডারসন?
ব্যক্তিগত দ্বৈরথের দিক থেকেও এবারের ডার্বি বেশ আকর্ষণীয়। মাঝমাঠে ইউনাইটেডের কোবি মাইনুর বিপরীতে থাকবেন সিটির নতুন মিডফিল্ডার এলিয়ট অ্যান্ডারসন। নটিংহাম থেকে ১১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ডে আসা অ্যান্ডারসন মৌসুমের শুরুতেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
কভেন্ট্রি সিটির বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানের জয়ে তাঁর পারফরম্যান্স বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। প্রেসিং, পাসিং, প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামানো এবং চাপের মধ্যেও বল ধরে রাখার দক্ষতার কারণে তাঁকে সিটির সাবেক তারকা রদ্রির সঙ্গে তুলনা করেছেন অনেকে।
ইউনাইটেডের হয়ে ক্যারিকের অধীনে মাইনুও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ঘরের মাঠে ক্যারিকের অধীনে সর্বশেষ ১০ লিগ ম্যাচের নয়টিতেই একাদশে ছিলেন তিনি। যে ম্যাচে খেলেননি, সেই লিডসের বিপক্ষেই হারতে হয়েছিল ইউনাইটেডকে। ইপসউইচের বিপক্ষেও তাঁর পারফরম্যান্স নজর কেড়েছে। হ্যারি ম্যাগুয়ারের চোখে মাইনু ‘মিডফিল্ড মনস্টার’।
তাই আজকের ডার্বিতে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকে, সেটি শুধু ম্যাচের ফল নয়, ইংল্যান্ডের ভবিষ্যৎ মিডফিল্ড নিয়েও কিছুটা ইঙ্গিত দিতে পারে।
সমর্থকদের ক্ষোভ কি প্রভাব ফেলবে ইউনাইটেডের খেলায়?
এবারের ডার্বির উত্তাপ মাঠের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সমর্থকগোষ্ঠী ‘দ্য ১৯৫৮’ ম্যাচের আগে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে। টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে ক্লাবের নেওয়া পদক্ষেপকে তারা অতিরিক্ত কঠোর এবং যথেষ্ট স্বচ্ছ নয় বলে মনে করছে।
ইউনাইটেড জানিয়েছে, টিকিট ব্যবস্থাপনা নিয়ে ৬৮৫টি অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আরও ৪৬৪ সমর্থককে দেওয়া হয়েছে তুলনামূলক কম শাস্তি অথবা চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। পাশাপাশি ১ হাজার ৬১৭টি অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্ত হওয়ায় সেগুলোও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সমর্থকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের সমর্থকদেরও যথেষ্ট স্বচ্ছতা ছাড়াই সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। এ নিয়ে ছয়টি সমর্থকগোষ্ঠী যৌথ বিবৃতিও দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ডার্বির আগে গ্যালারিতে সমর্থকদের প্রতিবাদ কতটা দৃশ্যমান হয় এবং সেটি খেলোয়াড়দের মানসিকতায় কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা দেখার বিষয়। তবে এটুকু স্পষ্ট, মাঠের বাইরে ইউনাইটেড ও তার সমর্থকদের সম্পর্ক এখন পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই।
সব মিলিয়ে আজকের ম্যানচেস্টার ডার্বি শুধু দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই নয়। এটি হতে পারে দুই নতুন কোচের দর্শনের পরীক্ষা, সিটির আধিপত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইঙ্গিত এবং ইউনাইটেডের ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্যেরও বড় পরীক্ষা।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ